অপুষ্টিতে ভোগা মায়েরা তাদের নবজাতক সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়াতে না পারলে কেমন কষ্ট পায়, অনুমান করতে পারেন? মানুষের বাড়িতেদোকানে খাবারের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে কেমন লাগে, ভাবতে পারেন?

হয়তো পারছেন। আর যখন জানবেন এরা সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত খাবার তিনচারমাস ধরে পায়নি, তখন নিশ্চয়ই আরো খারাপ লাগছে আপনাদের।

এইটুকু শুনে অনেকেরই খারাপ লাগবে। যারা কিপ্টা তাদেরও।

আমাদের দেশে এরকম লাখ লাখ মানুষ আছে যারা প্রতিদিন কম খেয়ে, কোন বেলা না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। খোদ ঢাকা শহরের রাস্তায় এমন মানুষ পাবেন আপনি যারা ভিক্ষাও পায় না, আবার কারো সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতেও পারেনা। জোর করে খাবার কেড়ে নিতে পারেনা; আবার রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিক হিসেবে তার ন্যূনতম অধিকারটুকু আদায় করতে পারেনা।

যে দূর্ভাগা মায়েদের কথা বলছিলাম ওরা আসলে মানুষ না, বানর। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় সন্তোষ বিট এলাকার প্রায় উধাও হয়ে যাওয়া শাল বনের বানর এরা।

একটা সময় ছিল যখন এদের খাবারের অভাব ছিল না; প্রাকৃতিক এই বন থেকেই তারা অফুরন্ত খাবার পেত। কিন্তু এখন উন্নয়নের জোয়ারে কিছু মানুষের পকেটে টাকা ঢুকেছে, তাদের ডাইনিং টেবিলে বাহারী খাবারের পসরা বসছে; কিন্তু ওদিকে খাদ্যের উৎস হারিয়ে বানরগুলো এখন সেই অমানুষগুলোর উপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

শিল্পকারখানা, বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি, কাঠ পাচারকারীদের অবৈধ ও পরিবেশবিদ্ধংসী কর্মকান্ডে এই জঙ্গলের এখন বেহাল দশা।

গত কয়েক বছরে এখানকার বানরের সংখ্যা কমেছে আশংকাজনক হারে। শেষ পর্যন্ত এখন প্রায় ৩০০ বানর কোন রকমে টিকে আছে। কিন্তু স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কর্তাব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনার কারনে জানুয়ারি থেকে তাদের জন্য মাসিক বরাদ্দকৃত ৫০ কেজি চাল পায়নি। কারন তারা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন!

এই চালও যথেষ্ঠ নয়। এদের জন্য বাদাম, শসা, কলা ইত্যাদির ব্যবস্থা করাটাও জরুরি।

ছবিঃ হাসিবুর রেজা কল্লোলএর মধ্যে ঢাকার একটি পশু কল্যাণ সংগঠন “পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার” পত্রিকা মারফত খবর পেয়ে ফুলবাড়িয়ার বানরদের জন্য খাবার নিয়ে যায়। ঢাকায় ফিরে ফেসবুকে সেই ক্ষুধার্তঅপুষ্টিতে ভোগা বানরদের গল্প শেয়ার করে সবার সাথে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে বুঝতে পারে এই বানরগুলোকে রক্ষা করতে গেলে এদের খাদ্যের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।

সেই পোস্ট দেখে আমি ফুলবাড়িয়ার স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করে ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানলাম। খবর নিয়ে দেখলাম ভিজিএফ প্রকল্প থেকে বানরদের জন্য চালের বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়েছিল গত বছর। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় কেউ আর বানরদের দায়িত্ব নিতে চায়নি, কেননা চেয়ারম্যানমেম্বার বদলে যেতে পারে তাই।

নির্বাচনের ফলাফলের খবর আর নেইনি, তবে ১২ তারিখে জানতে পারলাম তার দুইতিনদিন আগে আবার চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। অনেক রাগক্ষোভের মধ্যেও শান্তি পেলাম।

কিন্তু পরক্ষনেই ওদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কষ্ট পেলাম। কেউ কি সারা বছর ওদের খবর রাখবে? যারা গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে, শিল্পকারখানাবাড়িঘর বানিয়েছে, তারা কি দায়িত্ব নেবে?

তাদেরই তো নেয়া উচিত। এখন রাষ্ট্রের উচিত এদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ এই শাল বনের পশুপাখিদের জন্য খাবারের টাকা আদায় করা।

পাশাপাশি যেসব সরকারি পরিকল্পনাবিদ ও অনুমোদনকারীর অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারনে এখানে বন উজাড় হলো এবং নতুন বন তৈরি হলো না, খাদ্যাভাব হলো, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা; আর যেসব কর্মকর্তার খামখেয়ালীর কারনে প্রায় ২৫জন মা তাদের নবজাতকদের মুখে খাবার দিতে পারেনি তাদেরকে কোন খাবার না দিয়ে সাতদিন তপ্ত রোদের মধ্যে ফেলে রাখা।

এরকম খাবারের অভাবে কষ্টে আছে মাদারীপুরের চর মুগুরিয়াধামরাইয়ের বানরেরা। অপরাধ না করেও শাস্তি পাচ্ছে তারা। আর যারা অপরাধ করছে তারা স্বদম্ভে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরই নাম আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা।

এরকম খাদ্যাভাবের সবচেয়ে আশংকার দিক হলো বনের প্রাণীরা খাবারের জন্য মরীয়া হয়ে উঠলে মানুষের আবাসস্থলে ঘুর ঘুর করবে; হামলা চালাবে, খাবার চুরি করবে, খেতে না দিলে রাগেক্ষোভে আক্রমন করবে।

ঠিক একই কারনে সুন্দরবনের পশুরাও একদিন আশেপাশের জনবসতিতে হামলা করা শুরু করবে।