ভিক্ষুকদের গনহারে তুচ্ছ করছেন কেন?


Beggarভিক্ষুকরা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘুরাঘুরি করতে পারবেনা। এতে করে দ্রুত উন্নয়নশীল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হয়। এ দেশে ভিক্ষাবৃত্তি চলতে পারেনা … এভাবেই চিন্তা করেন আমাদের দেশের সমাজকল্যাণ ও সমাজসেবা বিভাগের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা।

তাই বিদেশীদের যাতায়াতের এলাকাগুলোতে (হোটেল সোনারগাঁও, সাবেক হোটেল রূপসী বাংলা মোড়, বেইলী রোড, বিমানবন্দর, হোটেল র‌্যাডিসন, দূতাবাস ও কূটনৈতিক জোন – গুলশান, বারিধারা) দেশের সুনাম বিনষ্টকারী ভিক্ষুকদের চলাচল ও কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হলো সরকারিভাবে। মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে এসব এলাকায় কোনো ভিক্ষুক থাকবে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। কোনো ভিক্ষুক দেখা গেলে তাকে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতাসহ বিভিন্ন সময় অর্থমন্ত্রী ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের কথা বলেছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কিভাবে চলছে সেই উদ্যোগ?

শুরু থেকেই এই প্রকল্পে সহায়তা করছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া। গত সাত বছরে বেশকিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেলো কিছু অপরাধীচক্র দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে কাজে লাগায়। বিনিময়ে পায় কমিশন। আবার দুই-একজন ভিক্ষুককে দেখা গেলো তাদের নিজের বাড়ি পর্যন্ত আছে, যার প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী একবার বলেছিলেন এদেশে ভিক্ষুক নেই, বরং এরা প্রাসাদের মালিক।

image

ফলাফল এই যে, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষ এখন ভিক্ষুকের বাড়িয়ে দেয়া হাত দেখলে বা “কয়টা টাহা দ্যান” বা “আল্লাহ আল্লাহ” নাম জপা অন্ধ ও বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকের কন্ঠ শুনলেই “মাফ করেন” বলে চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকায় বা সরে যায়। রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে ঢাকার বাইরের ভিক্ষুকরা এখানে আসে বেশি উপার্জনের আশায়।

সেই ভিক্ষুক বা অসহায় মানুষদের চোখমুখ দেখেও অবস্থাপন্ন মানুষেরা বুঝে না তারা সত্যিকারের ভিক্ষুক কিনা। সবাইকেই প্রতারক মনে করে।

ঢাকায় ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সাহায্য পাবার হার কমে যাওয়ায় আজকাল অনেক ভিক্ষুক বিভিন্ন কৌশল নেয়; যেমন মাথায় টুপি পরা, আল্লাহ’র নাম জপ করা, মসজিদ-কবরস্থানের সামনে অবস্থান নেওয়া ইত্যাদি।

এদের মধ্যে কতভাগ প্রতারক তা আমরা খেয়াল করি কতজন?

image

আমরা কি আয়না দেখে নিজেকে জিজ্ঞেস করি “এত অমানবিক হয়ে যাচ্ছি কেন?” “এদের প্রতি এত ঘৃনাবোধ তৈরি হচ্ছে কেন?”

শুধু সমাজ নয়, এখন রাষ্ট্রের চরিত্র ও এরকম। বাংলাদেশ এখন লোকদেখানো উন্নয়নের পথে এগুচ্ছে। এই অবস্থায় উন্নয়নবিরোধী সবকিছুই পেছনে সরিয়ে রাখতে হবে। তাই কাগজে-কলমে পুনর্বাসনের কথা বললেও, সাংবাধানিকভাবে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের কথা থাকলেও নানা অনিয়ম ও বে-আইনী কর্মকান্ড ও দমননীতির মাধ্যমে পরিস্থতি আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে সরকারিভাবেই।

২০১১ সালে ভবঘুরে ও আশ্রয়হীনদের পুনর্বাসনের জন্য একটি আইন করা হয় যা সংসদে পেশ করার পর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়ে, কেননা সেখানে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়।সেই ক্ষমতাবলে গ্রেপ্তারকৃতদের বিচার ছাড়া জেলে ভরে রাখার বিধানও রাখা হয়। সেই আইনে ভিক্ষাবৃত্তিকে একটি অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে যার শাস্তি তিন থেকে সাত বছরের জেল। দ্বিতীয়বার এই অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুন হবে। এদের শাস্তি দিতে মোবাইল কোর্টকেও ক্ষমতা দেয়া হয়।

এরপর আসে পুনর্বাসনের কথা।

image

আইনে আশ্রয়কেন্দ্র বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভবঘুরে ও ভিক্ষুকদের স্বল্প-মেয়াদী প্রশিক্ষনের কথা বলা আছে। তাছাড়া জেলায় জেলায় কেন্দ্র খোলার নির্দেশনাও আছে।

কিন্তু বাস্তবে সেই পুনর্বাসন প্রকল্প শুরুতেই দুর্নীতিবাজ আর অদক্ষ কর্মকর্তাদের খপ্পরে পড়ে যায় এবং পাইলট প্রকল্প ব্যর্থ হয়।

২০১০ সালের একটি পত্রিকার প্রতিবেদন “ভিক্ষুক জরিপ ও পুনর্বাসনে দেশে প্রথম প্রকল্প” অনুযায়ি, ভিক্ষুকদের নিয়ে ব্যতিক্রমী এক কর্মসূচিতে সাড়ে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ভিক্ষুক জরিপ এবং তাদের পুনর্বাসনে এ টাকা ব্যয় করা হবে। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত মানুষের সঠিক সংখ্যা, ভিক্ষাবৃত্তির কারণ ও ধরন জানা এবং তাদের পুনর্বাসন জরিপের উদ্দেশ্য। বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ জরিপ চালাবে। ছয় কোটি ১৫ লাখ টাকা ভিক্ষুক জরিপ এবং তাদের পুনর্বাসনে ছয় কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

জরিপের ধরন: ঢাকা মহানগরকে চারটি জোন এবং বিভাগীয় শহরকে ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে ভাগ করে একযোগে এ জরিপ চালানো হবে। জরিপের মাধ্যমে ভিক্ষুকের প্রকৃত সংখ্যা, লিঙ্গ, বয়স, ঠিকানা, ভিক্ষাবৃত্তির কারণ, ধরন ও তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং তালিকা তৈরি করা হবে। ঢাকা মহানগরের ভিক্ষুকদের যার যার জেলায় পুনর্বাসন করা হবে। প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভিক্ষুকদের বয়স্ক-ভাতা ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনা হবে। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষিত জনবলকে দেওয়া হবে ক্ষুদ্রঋণ। স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে বয়স্ক, অক্ষম এবং প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকদের।

পুনর্বাসন: ভিক্ষুকের ধরন, বয়স এবং সক্ষমতার ভিত্তিতে অস্থায়ী, সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও স্থায়ী—এ চার ভাগে পুনর্বাসন করা হবে। জেলা পর্যায়ে আটটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করে প্রতিটিতে ২৫০ জন করে মোট দুই হাজার ভিক্ষুককে অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে। ১২ বছর পর্যন্ত শিশু ভিক্ষুককে প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষা দিয়ে পুনর্বাসিত করা হবে। ১২ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ভিক্ষুককে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। পঞ্চাশোর্ধ্বদের আশ্রয়ণ ও অন্য আবাসন প্রকল্পে স্থায়ী পুনর্বাসন দেওয়া হবে। সমাজকল্যাণ-সচিবের নেতৃত্বে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণ, সমন্বয়সাধন ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করবে।

সেই একই পত্রিকা দুই বছর পর জানালো “ভিক্ষুকদের ১৭ কোটি টাকা নয়ছয় করেছে মন্ত্রণালয়।”

২০১০-১১ অর্থবছরে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক প্রকল্পের জন্য সাত কোটি এবং পরের অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু এই টাকা কাদের মাধ্যমে, কাদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে, তার সঠিক হিসাব মন্ত্রণালয় দিতে পারেনি।

আগের অর্থবছরে বরাদ্দ করা সাত কোটি টাকার মধ্যে ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা ছাড় করা হয় এবং তা বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে এনজিওগুলোর কোনো তালিকা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়নি।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য অপু উকিল বলেন, সরকার ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য টাকা দিয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে সংসদীয় কমিটি জানতে পেরেছে। টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু ভিক্ষুক পুনর্বাসনের কাজ সঠিকভাবে হয়নি। প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি দরের ভিত্তিতে এনজিওগুলোকে কাজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই টাকা কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার সঠিক হিসাব মন্ত্রণালয় দিতে পারেনি।

সেই দুর্নীতির স্বেতপত্র কখনো প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যেই আরো কিছু অনিয়ম দেখা গেলো।

কে বা কারা জরিপকৃত ভিক্ষুক ও নিরাশ্রয়ী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে পুনর্বাসনের জন্য ৫৮জনকে নির্বাচিত করে এবং তাদেরকে নিজেদের এলাকায় কাজ করে খাওয়ার জন্য ২০,০০০ টাকা সাহায্য দেয়া হয়। সেই টাকায় কাউকে রিক্সা কিনে দেওয়া হয় আর কাউকে বা দোকান বানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ভিক্ষুক নির্বাচন ও তদারকিতে অনিয়ম ও গাফিলতির কারনে এদের প্রত্যেকেই ঢাকায় ফিরে এসে আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে যুক্ত হয়। ব্যর্থ হয় পরীক্ষামূলক সেই প্রকল্প।

এরপর সব চুপচাপ। মিডিয়াতে দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে কোন কথা নেই। কিন্তু ভিক্ষুক ও নিরাশ্রয়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচারনা চলতে থাকে।

এরপর প্রয়াত মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর পরামর্শে ঢাকা শহরের সাতটি এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে একটি প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়। দুই বছর পর এই গেল সপ্তাহে সরকারিভাবে সেই পরিকল্পনা বাস্তয়নে কাজ শুরু করে মন্ত্রনালয়। অনুমান করা যায় যে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও পর্যটন মন্ত্রনালয় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করবে।

কিন্তু এভাবে কি ঢাকা ভিক্ষুকমুক্ত হবে? দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে দূর করা যাবে? অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের দিয়ে কি আপনারা দেশকে দারিদ্রমুক্ত করতে পারবেন? ভিক্ষাবৃত্তির কারনগুলো সমাধান করতে পারবেন?

নাহ, পারবেন না।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s