শাহবাগ আন্দোলন ক্ষমতাবান রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস যুগিয়েছিল


তিন বছর আগে ৫ই ফেব্রুয়ারি বিকেলে শাহবাগ গিয়েছিলাম। সকাল থেকে খুব বিক্ষিপ্ত ছিলাম কসাই কাদেরের রায় নিয়ে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম কয়েকটা; নাহ, রাগ কমেনি। চিৎকার করে গালি দিতে ইচ্ছে করছিল, বিক্ষোভে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছিল, পারিনি।
 
বিকেল ৩টার দিকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুজ মোবাইলে এসএমএস পাঠালোঃ “ভাই শাহবাগে রায়ের বিরুদ্ধে মানববন্ধন হচ্ছে। যাবেন নাকি?” আর দেরী করলাম না। অফিসে বসকে বলে ধানমন্ডি ২৭ থেকে রওনা হলাম। কিভাবে শাহবাগ ছুটে গেছি এখন আর মনে নেই। তবে অনেক দ্রুত গিয়েছিলাম মনে আছে। রায়ের বিরুদ্ধে রাজাকারদের ডাকা হরতাল থাকায় হয়তো দ্রুত যেতে পেরেছিলাম।
 
শাহবাগ মোড়ে গিয়ে দেখি জাতীয় জাদুঘরের সামনে একটা মানুষের কাতার। মূল ফটকের সামনে ব্যানার হাতে আয়োজকেরা আর তাদের ঘিরে মিডিয়ার ক্যামেরা, প্রতিবেদকেরা। সবার চোখেমুখে ক্ষোভ, আর সমর্থকের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মুখে জ্বলজ্বলে হাসি। এই সুখ ছিল রাজাকারের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠের মানুষদের মিলন মেলার কারনে।
 
পরবর্তী মুহুর্তগুলোতে আরো কয়েকজন পরিচিত মানুষকে পেয়েছিলাম যারা ফেসবুকে-ব্লগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সবসময় সরব ছিলেন। মানবশিকল ক্রমেই দীর্ঘতর হলো। পৌনে ৫টার দিকে মাহমুদুল হক মুনসী ভাই সবাইকে বললেনঃ “আমরা শাহবাগ মোড় ঘেরাও করবো, অবস্থান ঘর্মঘট করবো।”
 
মিছিল করে আমরা শাগবাগ মোড়ে অবস্থান নিলাম। আয়োজকেরা নিজেরা আর মিডিয়ার সাথে আলাপ চালাল; দূর থেকেও তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল অনেক হিসেব-নিকেশ হচ্ছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সবাই মোড়কে ঘিরে চারদিকে মানব শিকল তৈরি করলো।
 
ছয়টার দিকে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসলো কে বা কারা সবার হাতে মোমবাতি দিলো। আমিও আমার হাতের মোমবাতিটা জ্বালিয়ে বসে রইলাম দক্ষিনদিকের রাস্তা আটকে। তারপর শ্লোগানে মুখরিত কিছু মানুষ আসলো মশাল মিছিল নিয়ে। মোড়ে তখন একটা রিক্সায় রাখা মাইক থেকে বক্তব্য-শ্লোগান চলছে।
 
এর কিছুক্ষন পর আসলো ছাত্রলীগ। এক মূর্তিমান আতংক তৈরি করলো তারা। তাদের আসার ধরণ দেখে মনে হয়েছিল “ভিভিআইপিরা এসেছে, তাড়াতাড়ি জায়গা ছেড়ে দাও সবাই!” ওরা সত্যি দখল করে নিলো সব। মাইক থেকে শুরু করে সামনের সারি… এর মধ্যেই অনেকে বিরক্ত হয়ে অবরোধ ছেড়ে দূরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা চালালো আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে।
 
আমিও বিরক্ত, কিন্তু আমার দাবি থেকে সরে যেতে চাইনি। যদিও কোন বক্তব্য রাখিনি, তথাপি মনে হচ্ছিল এইসব জানা-অজানা মানুষদের সাথে আমার দাবির একটা মিল আছে। সেজন্যেই আমাকে এখানে থাকতে হবে। পরদিন অফিস যেহেতু দুপুরে সুতরাং সারারাত অবরোধে থাকবো মনস্থির করলাম। যদিও শ্লোগানে গলা বসে যাচ্ছিল, ক্ষুধায় শরীরে জোর পাছিলাম না…
 
কিছুক্ষন পর ঘোষণা আসলো চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলবে, প্রজেক্টর আনতে গেছে কেউ। দুটি প্রজেক্টর পাওয়া গেলো। সারারাত থাকার জন্য শক্তি পাওয়া গেলো।
 
সময় যাচ্ছিলো খুব দ্রুত। ১০টার দিকে ছাত্রলীগের ভাড়াটে কর্মীরা একে একে চলে যেতে লাগলো। মোড়টা অনেকটা হালকা ও পরিচ্ছন্ন লাগছিল। রাত ১২টার পর থেকে আয়োজকদের মধ্যে কেমন যেন একটা ছাড়াছাড়া ভাব দেখা গেলো। তারা একসাথে বসে আলোচনা করছিল। আরো কিছু ছোট ছোট গ্রুপ তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল।
 
অবশেষে ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ঘোষণা করলো তারা আপাততঃ অবরোধ উঠিয়ে নিচ্ছে, সকাল থেকে আবার শুরু হবে। কিন্তু তা মেনে নেয়নি অন্যরা। ব্যক্তি-দল সবাই বসে ছিল। নেতারা চলে গেলো। আমরা বাকীরা সারারাত বসে, শুয়ে, শ্লোগান দিয়ে কাটালাম।
 
তার পরের দিনগুলো নানা কর্মসূচী আর কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে পার হয়ে গেলো। রাজনৈতিক প্রভাব, ছোট গ্রুপগুলোর মধ্যে কোন্দল আর গোয়েন্দাদের কর্মকান্ডে এই আন্দোলন নানাভাবে বিতর্কিত হলেও; এই জনস্রোতকে থামিয়ে দিতে খালেদা জিয়া-আমার দেশ-ইনকিলাবের উস্কানী দিলেও; রাজীব হায়দার খুন হলেও এখান থেকেই আমার মতো আরো কয়েক লক্ষ মানুষের মুখে এসেছিল হার না মানা শ্লোগান। তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ-বিরোধীদের কোন স্থান নেই আর।
 
দীর্ঘ বক্তব্যের জন্য দুঃখিত এবং পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s