আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করতে গিয়ে…


গত দুই মাসে শেখেরটেক এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো, যত্রতত্র ফেলা নিয়ে অনেক ঘাম ফেলেছি, অনেক গঞ্জনা সহ্য করেছি। এখন আমাকে বাসাটা ছাড়তে হবে, কেননা পাশের বাসার মালিক আমার উপর গোস্বা করেছেন, অপমানিত হয়েছেন কারন আর মুখের উপর আমি বলেছিঃ “যখন আপনি নিজেই ময়লা-আবর্জনা পোড়াতে বলেন, সেখানে আপনার কাছে অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই।” তিনি হাউজিং-এর সভাপতি হয়েও তার ছেলে ও বাসার দাড়োয়ানকে বলেছিলেন ময়লা-আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলতে। ঝামেলা শেষ! কি বুদ্ধি!!!
জিডি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু থানায় কর্মরত আমার বন্ধু বললো সে বিষয়টা দেখবে। তাই আমার বন্ধুদের জানার জন্য কি ঘটেছিল সেই গল্পটা শেয়ার করছি।
বরাবর,
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা,
আদাবর থানা, ডিএমপি
বিষয়ঃ সাধারণ ডায়েরি লিপিবদ্ধকরণ
জনাব,
আমি প্রবীর কুমার সরকার, পেশা-চাকুরি, পিতাঃ সুবোধ চন্দ্র সরকার, ঠিকানা বাসা নং ৪৫ (৩য় তলা), রোড নং ৮, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, ব্লক-খ, -এর একজন ভাড়াটিয়া। এই এলাকায় আমি প্রায় পাঁচ বছর যাবত সুনামের সাথে বসবাস করছি এবং বিভিন্ন সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
ঢাকার অন্যান্য স্থানের মতো শেখেরটেক এলাকাতেও বিভিন্ন সময়ে বাড়ির দাড়োয়ান বা সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে ও জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এর ফলে দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে পড়াশুনা করে আমি জেনেছি যে, আবর্জনার মধ্যে থাকা খাদ্যের উচ্ছিস্ট অংশ, পলিথিন, চামড়া ও কাপড় পুড়ে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি করে যা মানবদেহের জন্য, বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের জন্য হুমকিস্বরূপ। এতে করে শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে তীব্র কাশি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদী ফল হিসেবে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। তাই গত দুই মাসে এই বিষয়ে এলাকায় আমি জনমতের চেষ্টা করেছি।
গত মাসখানেক আগে আমার বাসার পশ্চিম পাশের খালি প্লটে এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি ময়লা-আবর্জনা জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমি গিয়ে তাদের বুঝিয়ে নিবৃত্ত করি। এর কিছুদিন পর সেই প্লটে খেলাধুলার উদ্দেশ্যে পরিষ্কার করা হয় এবং সেই কাজে নিয়োজিত দুই কর্মী এক পর্যায়ে জমানো প্রায় এক ট্রাক আবর্জনায় আগুন লাগিয়ে দেয়। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে বলে যে, পাশের বাড়ির মালিক জনাব পাটোয়ারি (যিনি এই হাউজিং সোসাইটির সম্মানিত সভাপতি) সাহেব তাদেরকে আগুন জ্বালাতে নির্দেশনা দিয়েছে। আমি তাদেরকে বুঝিয়ে সেদিনের মতো থামাই এবং পরিবেশ ও এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যের কথা বলে আর আগুন জ্বালাতে নিষেধ করি। কিন্তু এরপর আরো চারদিন উক্ত বাসার দাড়োয়ান ও শিশুরা সেই খালি প্লটে জমানো আবর্জনাতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। প্রতি বারই আমি তাদের বুঝিয়ে নিবৃত্ত করি।
সর্বশেষ ১১ই জানুয়ারি সেই বাড়ির দাড়োয়ান মুরাদ আবারো আবর্জনাতে আগুন লাগালে আমি তাকে কারন জিজ্ঞাসা করি। সে আগুন না নিভিয়ে আমার প্রতি কটাক্ষ করে বলে দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে। আমি তাকে বারবার বলি যে কাজটা ঠিক নয়, কিন্তু তাকে থামাতে পারিনি। দাড়োয়ানের উদ্ধত ব্যবহারে আমি ভয় পেয়ে যাই এবং এই বিষয়টি সুরাহা করতে নীচে নেমে পাশ্ববর্তী বাসার কয়েকজন দাড়োয়ান ও দোকানদারকে ডেকে এরকম কাজ বন্ধ করতে অনুরোধ করি। নিরাপত্তার স্বার্থে আমি হাতে একটি ছোট লোহার পাইপ রেখেছিলাম যেন আমার উপর কোন হামলা হলে তা প্রতিহত করতে পারি। এসময় আমি খবর নিয়ে জানতে পারি পাটোয়ারি সাহেব বাসায় নেই। অবশেষে আমি আদাবর থানার পেট্রোল টিমের সাহায্য কামনা করি। পুলিশ কর্মকর্তারা এসে দাড়োয়ান মুরাদ ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে এমন পরিবেশ দূষণকারী কাজ না করতে নির্দেশ দেন। সেসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আমি জানাই যে পাইপ হাতে বের হওয়া আমার ঠিক হয়নি।
তার কয়েক ঘন্টার মধ্যে হাউজিং সোসাইটির দুইজন কর্মচারি আমার বাসায় এসে আমাকে তাদের অফিসে গিয়ে পাটোয়ারি সাহেবের সাথে দেখা করতে বলে। সেইদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে আমি ও আমার স্ত্রী শেখেরটেক ১০ নম্বরে অবস্থিত সেই অফিসে যাই এবং পাটোয়ারি সাহেব ও অন্যান্য আরো কয়েকজন বাড়ি মালিকের সামনে আমার বক্তব্য তুলে ধরি। পাটোয়ারি সাহেব আমাকে বলেন যে, দাড়োয়ানের সাথে কথা বলার জন্য বিনা অনুমতিতে তার বাড়ির পার্কিং এলাকায় পাইপ হাতে আমার যাওয়া ঠিক হয়নি। এই কথায় আমি সম্মত হই এবং ক্ষমা প্রার্থনা করি।
এরপর তিনি বলেন যে, পুলিশকে ডাকা আমার ঠিক হয়নি। আমি তাকে জানিয়েছি যে, যেহেতু হাউজিং সভাপতি নিজেই ময়লা-আবর্জনা জড়ো করে আগুন জ্বালাতে বলেছিলেন সেহেতু তার কাছে অভিযোগ জানানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। তথাপি আমি বলেছি তিনি চাইলে আমি হাউজিং সোসাইটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে পরিবেশ রক্ষায় একসাথে কাজ করবো। পাটোয়ারি সাহেবও আমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হন।
কিন্তু গত ১৪ই জানুয়ারি সকালে আমার বাড়ির মালিক আহসান সাহেব আমাকে জানান যে, তিনি হাউজিং সোসাইটির সভাপতি পাটোয়ারি সাহেব ও অন্য আরো কয়েকজন বাড়ি মালিকের সাথে বসেছিলেন। সেই আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, আমাকে এই বাসাটি ছাড়তে হবে। আমার বাড়ির মালিক আমাকে সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সময়-সুযোগমত বাসাটি ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। বাসা ছাড়ার জন্য হাউজিং সোসাইটি কোন কারন দেখায়নি।
উল্লেখ্য যে, আমার সাথে পাটোয়ারি সাহেবের আগে পরিচয় ছিল না, কোন শত্রুতাও নেই। তাছাড়া আমার বিরুদ্ধে কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা ভয় দেখানোর অভিযোগও নেই। উপরন্তু, আমি নানা সময়ে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিশয়ে পুলিশকে সহায়তা করে অপরাধ দমনে কাজ করেছি। এমতাবস্থায়, আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানানো আমার কর্তব্য মনে করছি।
অবশেষে জনাবের নিকট আমার প্রার্থনা এই যে, আমার এই আবেদনটি লিপিবদ্ধ করে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করবেন।
বিনীত,
প্রবীর কুমার সরকার
সাংবাদিক, ঢাকা ট্রিবিউন
Off the record: পাটোয়ারি সাহেব একজন পাতি আওয়ামীলীগ নেতা। চেহারা বিদঘুটে জানোয়ারের মতো। হাউজিং-এর অফিসে আমার কথা শুনছিলেন মাথা নিচু করে, চোখ বন্ধ করে; সম্ভবতঃ লজ্জায়। এক পর্যায়ে তিনি বললেন আমরা এতদিন ধরে সমাজসেবা করছি, আপনি হঠাৎ কোথা থেকে আসলেন?
Advertisements

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s