সর্বশেষ বিএনপির নেতা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী অনেক সাংবাদিক ও দলীয় সমর্থকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিল। কারন তার কথা বলার ধরণ ও নানাবিধ শব্দের ব্যবহার যা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা আপত্তিকর। সেজন্যে সাংবাদিকরা তার হাত থেকে টাকা নিয়ে তার বাসায় বসে সংবাদ সম্মেলন কাভার করলেও, সেসব কথা/চিত্র পত্রিকা বা টিভিতে প্রকাশের আগে দশবার ভাবতে হতো সম্পাদকদের।

চট্টগ্রামে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা অনেক, বিশেষ করে টাকার জন্য। টাকার সাপ্লাই থাকলে তারা রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল ও ভাংচুর চালাবে। এখন হয়তো টাকা নাই, তাই নেতাকে রক্ষা করতে কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা।

এটা ঠিক যে সাকা ভয়ানক ধূর্ত একটা মানুষরূপী জানোয়ার। সুতরাং তার দ্বারা যেকোন কিছু করাই সম্ভব।

২০১০ সালে গ্রেপ্তারের আগে পর্যন্ত তার ধারণা ছিল তার বিচার কেউ করতে পারবেনা। যেহেতু এত বছর পারেনি। টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মিথ্যার চাদরে ১৯৭১ সালের কর্মকান্ড ঢেকে রেখেছিল বহু বছর।

আর যখন বিচার শুরু হয়েই গেলো তখন প্রতি পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে জীবন রক্ষার চেষ্টা চালালো সাকা, তার পরিবার ও আইনজীবীরা। টাকার খেলা যে বেশ জমেছে তার একটা বড় প্রমান হলো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সাকার বড় ভাই গিয়াসউদ্দীন কাদের চৌধুর্বীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত না করা। তার নাম তদন্ত দলের তালিকাতে থাকলেও তা নিয়ে কাজ করেনি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল। এ বিষয়ে তদন্ত দল পুরোপুরি স্বাধীন। কোন আদালত বা আইনজীবী তাদেরকে আদেশ দিতে পারেনা। শুধু সরকার পারে।

নানা বাহানায় সাকার এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া পেছানো হয়েছিল। চেষ্টা থেমে থাকেনি কখনো। সর্বশেষ আপীল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে পূনর্বিবেচনার আবেদনের সাথে দেয়া পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও প্রত্যয়ন পত্র ভুয়া বলে প্রমানিত হয়। এর আগে ৫জন পাকিস্তানীর লিখিত বক্তব্য জমা দেয় সাকার আইনজীবীরা। এদের বক্তব্যেও অনেক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

Hindu-hater SQ Chowdhury’s falsehood: I was in Pakistan

মামলার শুরু থেকেই নানাভাবে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের হেয় করাই ছিল সাকার প্রতিদিনকার মূল কাজ।

সে বিরক্ত করতে পেরেছিল। এমনকি বিভিন্ন সময়ে সাবধান করে দেবার পরেও তার আচরণে কোন পরিবর্তন আসেনি। হয়তো সে বুঝে গিয়েছিল যে পালাবার আর পথ নেই, সুতরাং নাটকীয়তাই অটুট থাকুক। পাবলিক এসব খুব খায়।

প্রথম সাক্ষী হিসেবে নিজে বক্তব্য দিলেও সাকা কখনো পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সনদ বা প্রত্যয়ন পত্র দেখাতে পারেনি। এমনকি আপীল শুনানীতেও না। একদম শেষ পর্যায়ে দিলেও দেখা গেলো সেসব কাগজ-পত্র আসলে ভুয়া।

খারাপ মানুষের লজ্জা নাই, যেমন নাই সাকা কিংবা তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের।

দিন বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু তাই বলে চরিত্রের বড় পরিবর্তন এমনি এমনি আসেনা। সেটা হয় স্বদিচ্ছা থাকলেই।

বদলে গেছেন খন্দকার মাহবুব। তিনি ১৯৭২ সালে দালাল আইনের আওতায় গঠিত ৭২টি ট্রাইব্যুনালের একজন সরকারি আইনজীবী। এখন তিনি জামায়াত ও বিএনপির যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আদালতে লড়ছেন এবং শতশত মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকার চেষ্টা করছেন।

২০১৩ সালের পহেলা অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল যখন সাকাকে মৃত্যুদন্ড দেয়, তখন সে এক সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত সবার বিচার করা হবে মর্মে হুমকি দেন। পরে ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার দায় থেকে মুক্তি পান এই গিরগিটি সদৃশ আইনজীবী।

এমন আরেকজন ডেভিড বার্গম্যান, যিনি দুই যুগ আগে ব্রিটেনে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য নির্মিত তথ্যচিত্রের পেছনে কাজ করেছেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। ড. কামালের মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয় এবং ২০০৭ থেকে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করে নিউ এজ-সহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করেছেন।

আর তার প্রধান কাজ হলো যুদ্ধাপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া “নিরপেক্ষভাবে” পর্যালোচনা করা। মানে ট্রাইব্যুনাল ও দেশের বিচারিক ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদ করা। মানে দোষ ধরা। মানে সরকারবিরোধী অবস্থানে থেকে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। তার সর্বশেষ বোমাটি ছিল পাকিস্তানি ৫জনের বক্তব্য নিলে আদালত হয়তো সাকাকে মুক্তি দিতো!

আগেই বলেছি সেইসব বক্তব্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমি আসলে আলোচনা করবো সাকা যে আসলে বাংলাদেশেই ছিল এবং গনহত্যা, অপহরণ ও নির্যাতন করেছিল তা প্রমান করা।

“২৯শে মার্চ, ১৯৭১ থেকে ২০শে এপ্রিল, ১৯৭৪ পর্যন্ত আমি পাকিস্তান ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা,” ট্রাইব্যুনালে এমন দাবী করলেও প্রমাণ করতে পারেনি সাকা চৌধুরী।

অন্যদিকে সরকারপক্ষ কয়েকটা তথ্য-প্রমাণ হাজির করে এবং ১৪জন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ করে যে সাকা আসলে পাকিস্তান গিয়েছিল সেপ্টেম্বরে, মার্চ মাসে নয়। সেইসব তথ্যের মধ্যে ছিল দৈনিক পাকিস্তানের ২৯শে সেপ্টেম্বর সংখ্যার একটি খবর ও ২রা অক্টোবরের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে ২২শে সেপ্টেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে সাকার গাড়ির ড্রাইভার নিহত হয় এবং সাকা মারাত্মক আহত হয়।

এসব তথ্য-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে সাকা আসলে দেশেই ছিল এবং সেপ্টেম্বরের শেষে তার জন্মস্থান পাকিস্তানে চলে যায়।

সাকার লোক ট্রাইব্যুনালের কর্মচারীদের টাকা দিয়ে হাত করে আদালতের চেয়ারম্যানের কম্পিউটার থেকে রায়ের খসড়া কপি চুরি করে ধরা পড়েছে। আবার সাকার বন্ধু সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের আইনজীবী মেয়ে ধরা খেলো জঙ্গি গ্রুপ হামজা ব্রিগেডকে অর্থ দিতে গিয়ে।

কদিন পরে শুনবো সাকার পরিবারের লোকজন, বিশেষ করে ছেলে হুম্মাম কাদের, টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে বিদেশী ও পুলিশের উপর হামলা-খুন, তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি কর্মকান্ড করেছে।

অসম্ভব না। এই জানোয়ারটাকে দিয়ে সব খারাপ কাজই করা সম্ভব।

কিছুদিন আগে দুইটা মামলার অগ্রগতি জানতে জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামের পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। কাশিমপুর কারাগারে সাকার খেদমতে নিযুক্ত এক বন্দীকে যৌন নিগ্রহ করায় তার বাবা একটি মামলা করেন জয়দেবপুর আদালতে। থানার কর্মকর্তাদের মতে সাকার পরিবার সেই বিষয়টি আদালতের বাইরেই মিটমাট করে ফেলেছে।

আরেকটি ঘটনা হলো সাকার মামলার একজন সাক্ষীর রহস্যজনক মৃত্যু।তার নাম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনু। চট্টগ্রামের খুলশী ও বায়েজিদ থানার কোন অফিসারই মামলাটির বিষয়ে কোন ধারণা দিতে পারেননি।

Advertisements