দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা পুনর্বাসিত রাজাকারদের মুখোশ উন্মোচিত করে সেই সব পরাক্রমশালীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন আপনি, সেই ২০০১ সালে। যুদ্ধাপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পেছনে যারা কাজ করে চলেছেন তাদের মধ্যে আপনার নাম শুনেছিলাম অনেক আগেই। কিন্তু আমি লজ্জিত যে জনকন্ঠ পত্রিকায় “সেই রাজাকার” সিরিজের লেখাগুলো আমি পড়িনি।

তখনকার অন্যান্য পত্রিকা-টিভিগুলো ও এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। বিচারের দাবীতে সারাদেশে রোল ওঠেনি এইসব ঘৃন্য রাজাকারদের বিরুদ্ধে।

আর তাই বাচ্চু রাজাকারের মত জঘন্য একটা কীট দেশের টিভি চ্যানেলে ধর্ম ব্যবসা করে গেছে বছরের পর বছর, নুলা মুসার মত রাজাকারেরা দেশে-বিদেশে হাততালি কুড়িয়েছে টাকার গরমে।

হয়তো আপনি গ্রেপ্তার না হলে আমরা জানতেই পারতাম না এসব কুকীর্তির কথা। শুধু এই দুই ক্ষমতাশালী রাজাকারই না, আপনি আপনার সত্য ও বলিষ্ঠ হাতে লিখেছেন ফরিদপুরের খন্দকার মোশাররফের বে-আইনি কীর্তি আর মিথ্যাচার নিয়েও।

নিরাপত্তা চেয়ে উল্টো মানহানির অভিযোগে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে নেয়া হলেও আপনি ভয় পাননি। আপনার বিরুদ্ধে আনা “মন্ত্রীর মানহানির অভিযোগ” আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো ওইসব নেতা আর ধর্ম ব্যবসায়িরা কতটা নির্লজ্জ।

প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মুখে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা রুখতে রাষ্ট্র আপনাকে জামিন দিতে বাধ্য হয়েছে। কারন মন্ত্রী সাহেব মাথা গরম করে অনেকগুলো আইনী বিষয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছিলেন।

শেরে বাংলানগর থানা আর ডিবি পুলিশকে দিয়ে বে-আইনীভাবে আপনাকে তুলে নিয়ে চোখে কাপড় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো।

মামলাটা নিজেরই করার কথা; তা না করে ব্যক্তিগত এক চামচাকে দিয়ে মামলা করালেন আইসিটি আইনে। এদিকে মামলার বাদী স্বীকার করতে রাজী না যে মন্ত্রীই তাকে বলেছেন মামলা করতে।

মামলা না করেই গ্রেপ্তার করে আর দাগী আসামীদের মতো মাঝরাতে গোয়েন্দারা আপনাকে ফরিদপুর নিয়ে গেলো!

পরদিন ফরিদপুরের আদালতের আওয়ামী সমর্থক/টাকার গোলাম বিচারক আপনার জামিন আবেদন বাতিল করে পুলিশের রিমান্ড আবেদন গ্রহণ করলেন। তিনি কি সংবিধান জানেন না? তিনি কি জানতেন না পঙ্গু ব্যক্তিদের রিমান্ডে দেয়া যায় না?

শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার সুবাদে ক্ষমতার এমন অপব্যবহার করবেন এমনটা এই দেশে অসম্ভব না।

মোশাররফ সাহেব খুশি যে তিনি প্রবীর সিকদারকে শিক্ষা দিতে পেরেছেন! তাকে গ্রেপ্তার করানো থেকে শুরু করে হাতকড়া আর রিমান্ড…সবই যেন পরিকল্পনামাফিক হলো।

বুঝা যাচ্ছে অরুন কুমার গুহের বাড়ি দখল ও পারিবারিক মন্দির ভাঙ্গা নিয়ে আর কেউ কথা বললে তাদেরকেও প্রধানমন্ত্রী বেয়াই সাহেব ক্ষমতা দেখাবেন।

যেই ব্যক্তি প্রথম প্রকাশ্যে এই অভিযোগটি তুললেন, সেই রানা দাশগুপ্ত ইতিমধ্যেই ফরিদপুরের হিন্দু ধর্ম ব্যবসায়িদের কুনজরে পড়েছেন। তারা বলছে রানা দাশগুপ্ত নাকি সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক নষ্টের গভীর ষড়যন্ত্র করছেন!

রানা দাশগুপ্ত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী না হলে হয়তো তাকেও গ্রেপ্তার, রিমান্ড থেকে শুরু করে নানা ধরণের হয়রানির শিকার হতে হতো। কে জানে, হয়তো সামনে কোন একদিন তিনি ও বিপদে পড়বেন…

কারন মোশাররফ সাহেব সেই নুলা মুসার সাথে যে হাত মেলাননি তা কে বলতে পারে! বাচ্চু রাজাকার, জামায়াতের মুজাহিদ বা খোকন রাজাকাররদের স্বার্থও তো আছে এর সাথে!

আফসোস! এই আওয়ামীলীগের আমলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইতে গেলে সাবধানে কথা বলতে হয়। বড় রাজাকারেরা সব জামায়াতের হলেও, একাত্তরে বিভিন্ন জেলা বা উপজেলাভিত্তিক রাজাকারদের অনেকেই তো পরে আওয়ামীলীগ ও এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছে। সবাই তো আর বিএনপি বা জামায়াতে যায় নি।

পরিচয় যাই হোক, কারো বিরুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাদের সাহায্য করার অভিযোগ আসলে অবশ্যই তা তদন্ত করতে হবে। এই রাষ্ট্রকে সত্য প্রকাশ করতেই হবে। এই মহান দায়িত্ব আওয়ামীলীগ সফলভাবে পালন করতে সমর্থ হলেই কেবল একাত্তরের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে, সমাজে ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণ হবে।

অপেক্ষায় আছি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতি শীঘ্র নুলা মুসার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তের আদেশ দিবেন।

আর দুর্নীতি/টাকার খেলা হলো গ্যাংগ্রীনের মতো। রাজনীতি, ব্যবসা, ধর্ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য…সব খাতকে কুড়ে কুরে খাচ্ছে। ফলে যতটুকু ভালো কাজ হচ্ছে সেটাও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। লোভ সামলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে সরকার চাইলেই স্মরণীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।

এই সামান্য ত্যাগ স্বীকার করতে আমরা সাধারণ জনগন সরকারের কাছে মিনতি করি, কিন্তু এমন এক দিন আসবে যখন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। তখন পুলিশ, বিচার বিভাগ তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, আর রাঘব-বোয়ালেরাও রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে।

জানি সেই দিন খুব সহসাই আসবেনা। কিন্তু আসবেই। এই চরম দমবন্ধ অবস্থা চিরকাল স্থায়ী হবেনা।

একাত্তরের শহীদ পরিবারের সন্তান, নির্ভীক সাংবাদিক প্রবীর সিকদার, আপনাকে আবারো সালাম জানাই।

মোশাররফ সাহেবের সম্পর্কে বাড়ি দখলের বিষয়ে আরো জানতে পড়ুনঃ

সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করছেন মন্ত্রী-সাংসদ-প্রশাসন

খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিন্দা ও প্রতিবাদ

হিন্দু বাড়ি দখলের অভিযোগের ব্যাখ্যা দিলেন মন্ত্রী

Advertisements