আমিনবাজারের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে এইসব ইটের ভাটা চলছে এক যুগেরও বেশী সময় ধরে; এগুলোর তিন কিলোমিটারের মধ্যেই আছে আবাসিক এলাকাও।
আমিনবাজারের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে এইসব ইটের ভাটা চলছে এক যুগেরও বেশী সময় ধরে; এগুলোর তিন কিলোমিটারের মধ্যেই আছে আবাসিক এলাকাও। আর ধোঁয়া তো দেখাই যাচ্ছে কেমন!  

নগরায়ন ও শিল্পায়নের দ্রুত বিকাশের কারনে নির্মান উপকরনের মধ্যে ইটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। তাই ইটের ভাটাগুলোর বিশ্রাম নেই, খুব বৃষ্টি না হলে মালিকরা চুলা বন্ধ করেনা। আর তদারকী কর্তৃপক্ষেরও নিষেধ নেই, উন্নয়ন বলে কথা।

হুম, উন্নয়ন কে না চায়! কিন্তু কিসের বিনিময়ে সেই উন্নয়ন (!) অর্জিত হচ্ছে এবং সেই অর্জনের ভাগীদার কে বা কারা বা কতজন?

আইন থাকা সত্বেও এর যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপক বিস্তৃতি, তদারকি ও পরিবেশ আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় গাফিলতি, বাজেটে পরিবেশ সংরক্ষন ও উন্নয়নে গুরুত্ব না দেয়ায় এবং সর্বোপরি সরকারগুলোর পরিবেশ রক্ষার চেয়ে আপাতত “ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব” আচরনের কারনে সুবিধা নিচ্ছে অবৈধ ও বেআইনিভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ইটভাটা মালিকরাও। এই খাতকে নিয়ন্ত্রনে সরকার আইন করে ১৯৮৯ সালে, যা পরে ২০০১ সালে একবার সংস্কার করা হয়। গত সপ্তাহের মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই আইনকে আরো কিছুটা কঠোর করে নতুন একটি আইনের খসড়ায় সই করেন প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু সমস্যাটা হলো আইনের প্রয়োগে।

শুরুটা হয় ভাটার জন্য স্থান নির্বাচন নিয়ে, তারপর সেটার জন্য ছাড়পত্র যোগাড় করতে গিয়ে ঘুষের বিনিময়ে অন্যায় সুবিধা নেয়া, ইট বানাতে আইন অমান্য করে মাটি সংগ্রহ এবং তা পোড়াতে মানসম্পন্ন কয়লা ব্যবহার না করে কাঠ ও রাবারের ব্যবহার যা আমাদের বাতাসকে চরম দূষিত করে চলেছে।

সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক জরিপে আমাদের দেশের, বিশেষ করে রাজধানীর, বায়ুকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত কয়েকটির মধ্যে ফেলা হয়েছে। এই তথ্য মিথ্যে নয়। শহরের কোন উঁচু ভবন থেকে দূরে তাকালেই দেখা যায় ধোঁয়াশা, সাথে আছে ধুলাবালির প্রকোপ। ২০১২ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষাতেও দেখা যায় ঢাকার বায়ুদূষনের অন্যতম কারন হিসেবে এখন আর আগের মত যানবাহন নেই, এসেছে ইটের ভাটা।

কোনদিকে যাচ্ছি আমরা? জ্বালানী তেলের দূষন কিছুটা কমলেও মাশরুমের মত এখানে-সেখানে বেড়ে উঠা ইটের ভাটাগুলো এখন সবার গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে। আর কয়েক বছর পর কি ঘটতে যাচ্ছে?

ইতিমধ্যেই ঢাকাবাসীর মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসসহ নানা সমস্যার প্রকোপ বেড়ে চলেছে। কৃষিজমি-গাছপালা-জলাশয়ের ক্ষতি হচ্ছে। ইতিমধ্যেই জলবায়ুর পরিবর্তনের কারনে তাপমাত্রার উষ্ণতা বাড়ার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। তার উপর ঢাকার আশেপাশের ৫০০-এর উপর ইটের ভাটাসহ সারাদেশের ১০০০০-১২০০০ চুল্লি থেকে নির্গত কার্বন ও অন্যান্য গ্যাস এবং বায়ু দূষনকারী ক্ষুদ্রকনার বিস্তারের কারনে পরিবেশ আরো প্রতিকূল হচ্ছে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের ১৯৯৯ সালের ২১শে নভেম্বর জারি করা একটি পরিপত্রে সেইরকম একটা আশংকার কথাই বলা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকদের কাছে লেখা সচিব সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ সাক্ষরিত সেই পত্রে তাদেরিকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নতুন ইটের ভাটার লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

কারন হিসেবে বলা হয়ঃ “…দেশে বিদ্যমান শত শত ইটের ভাটাসমূহে কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যেই বায়ুমন্ডলে প্রচুর সালফার ডিপোজিশন হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আশংকা করা হচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে এসিড বৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, অনেক ব্রিক ফিল্ডে কয়লা ব্যবহারের পাশাপাশি গাছ পোড়ানো হচ্ছে যা ইট পোড়ানো (নিয়ন্ত্রন) আইন এবং এর এর সংশোধনী অনুযায়ী নিষিদ্ধ।

উল্লেখিত দুই প্রকার কর্মকান্ডই পরিবেশের উপর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বিধায় অত্র মন্ত্রনালয় নীতিগতভাবে এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আপাতত নতুন কোন ব্রিক ফিল্ডের লাইসেন্স প্রদান করা ঠিক হবে না। এ প্রেক্ষিতে আপনার প্রশাসনের অধীন নতুন ইট ভাটাসমূহের অনুকূলে আপাতত লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি।”

পরবর্তীতে ২০০২ সালের ২০শে অক্টোবরের আরেকটি পরিপত্রের মাধ্যমে কঠোরভাবে আইন মেনে ইটের ভাটা পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়। তৎকালীন সচিব সাবিহউদ্দিন আহমেদ সার্কুলারটি জারি করেন।

অতঃপর ইটের ভাটাসংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন্য ৬ই নভেম্বর উপ-সচিব (প্রশাসন) শফিক আলম মেহেদী সাক্ষরিত একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে সকল জেলা প্রশাসককে একটি করে কমিটি করার কথা বলা হয়, যেখানে এলাকার মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইট ভাটার মালিকদের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকের অংশগ্রহন থাকবে।

২০০৩ সালের ৩১শে মার্চের প্রজ্ঞাপনটি আবার আরেককাঠি সরেস। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সাবিহউদ্দিনের সাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে আইন অনুযায়ি যেসব মালিক নির্ধারিত এলাকার তিন কিলোমিটার বাইরে ভাটা স্থাপন করেনি তাদেরকে দুইমাসের মধ্যে সেসব স্থাপনা সরানর আদেশ দেয়া হয়। অন্যথায় লাইসেন্স বাতিলসহ মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।

কিন্তু চোখে পড়ার মত সেরকম কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনি কারো, কারন যা যেভাবে যেমন ছিল তারা তো আছেই, যোগ হয়েছে আরো হাজারো বেআইনী ইটের ভাটা।

এরপর আরো কত আদেশ-নিষেধ-হুমকী এসেছে প্রশাসন থেকে, আর পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ তো আছেই। কিন্তু কই, পরিবর্তন তো দেখিনা।

এখনো দেশে হাজার হাজার ইটের ভাটা বেআইনীভাবেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং তা প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে। ঢাকা শহরের আশেপাশের এলাকাগুলোতে, মহাসড়কের পাশে, বুড়িগংগা-তুরাগের পাড়ে চোখে পড়বে শত শত চিমনি।

এরা ভাটা স্থাপন সংক্রান্ত আইনের সরাসরি বরখেলাপ করছে। আর যেসব ভাটার বৈধতা আছে তাদের একটা বড় অংশ আবার মাটি ও জ্বালানী বিষয়ে কোন নির্দেশনার তোয়াক্কা করছে না। তাছাড়া শিশুশ্রম ও নারীশ্রমিকদের মজুরি নিয়ে ঠকবাজী তো আছেই।

ইট যেহেতু আমাদের লাগবেই, তাই এর উৎপাদনকে আরো দূষনমুক্ত করতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর সে কাজটিই গত ৩/৪ বছর ধরে করেছে নানা দেশী-বিদেশী সংস্থা, সরকারিভাবে সহায়তা করছে ইউএনডিপি, যারা সম্প্রতি তিনটি নতুন ধরনের প্রযুক্তিকে এদেশে কাজে লাগানোর পক্ষে মত দিয়েছে। পুরোনো চিমনি পদ্ধতি বাদ দিয়ে এগুলোতে রুপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ২০১০ সালে।

বৈধ-অবৈধ সকল ভাটা মালিককে দুই বছরের সময় দিয়ে সরকার লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করে ২০১০ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর। কিন্তু প্রযুক্তিবদল যখন কোনভাবেই সন্তোষজনক হয়নি [২০১২ সালের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দাবী করেন ৫০০টি ভাটায় নতুন প্রযুক্তিতে ইট প্রস্তুত চলছিল], পরিবেশ অধিদপ্তর তখন আরো ছয় মাস বাড়িয়ে ২০১৩ সালের মার্চের ৩০ তারিখ সুযোগ দেয়। এতেও কাজ না হলে, ৩০শে জুন পর্যন্ত সময় বাড়ায় সরকার।

আর কত!

Advertisements