লালবাগের মিছিলে হেফাজতের ধর্মপ্রান-নবীপ্রেমী-ন্যায়পরায়ন শান্তির দূতেরা। ছবিঃ Dhaka Tribune
লালবাগের মিছিলে হেফাজতের ধর্মপ্রান-নবীপ্রেমী-ন্যায়পরায়ন শান্তির দূতদের মধ্যে কয়েকজন যারা বংগভবন দখলের হুমকী দিয়েছে। ছবিঃ Dhaka Tribune

১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজীবকে খুন করার পর জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঞ্চালক কয়েকটি ফেসবুক পেইজ ও পাকিস্তানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের একটা সাইটে সেই খবরটা প্রচার হয়, যারা বলতে থাকে রাজীব ছিল “নাস্তিক”, কিভাবে, সে ব্লগে ইসলাম ও মহানবীকে কটাক্ষ করে লেখালেখি করতো, প্রমান কি, নাই!

পরদিন আবার সেই ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচারনা পেল একটা ওয়ার্ডপ্রেস সাইট, যার মালিক ছিল নাকি মৃত রাজীব। সেখানে ১৯টি পোস্ট ছিল যার সবগুলোতেই মহানবী ও ইসলামকে কটাক্ষ করে বাংলায় নানা মন্তব্য ও কবিতা লিখা ছিল। আর যায় কোথায়! শুরু হয়ে গেলো শাহবাগের জামায়াত-শিবিরবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচী। কেননা “নাস্তিক” রাজীব শাহবাগে যেত, সেই আন্দোলনের সাথে একাত্ম ছিল, এবং সে জামায়াত-শিবিরকে ঘৃনা করতো। সুতরাং শাহবাগের সবাই নাস্তিক, এদেরকে নির্মূল করতে হবে ব্লাসফেমী আইন করে।

প্রজন্ম চত্বরের কর্মী আর তাদের লাখো সমর্থকরা হকচকিয়ে গেল এই আবিষ্কারে। কিন্তু দুইদিনের মধ্যেই দেখা গেলো সেই সাইটটা ভুয়া, কেননা সেটা তৈরি করা হয়েছে রাজীব খুন হবার পরের দিন। সে খবরও প্রমানসহ ফেসবুকে প্রচার হলো, কিন্তু সরকারী কর্মকর্তারা তা আজ-অবধি প্রকাশ করতে পারলেন না, নাকি করলেন না!

এরই মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতা-সমর্থকরা বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোটের অন্যান্য ইসলামী দলের সহায়তা নিয়ে সেই “ইসলাম ও নবী অবমাননার” খবর ছড়াতে শুরু করে দিয়েছে, ব্যবহার করেছে মসজিদ-মাদ্রাসা। তাতে ঘি ঢেলেছে ইনকিলাব, সেইসব অবমাননাকর লেখা ছাপিয়ে। আরেক কাঠি সরেস দৈনিক আমার দেশ, যার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান একজন দুর্নীতিবাজ দালাল ও বিএনপি’র প্রভাবশালী নেতা আর মালিকরা জামায়াতী। পত্রিকাটি সাংবাদিকতার মা-বাপ ভুলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শাহবাগে ছাত্র-জনতার ঢেউ দেখার পর থেকে যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছিল তার বিরোধীতা করতে এবং একটা “শক্তি”কে [আমি বলবো অপশক্তি] দাঁড় করাতে তা যেকোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে তুলনা করা চলে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধীদলকে চাঙ্গা করতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিকল্প খুঁজে পায়নি এরা।

ফলাফল পাওয়া গেল পরের শুক্রবারেই। শাহবাগের আন্দোলনের সাথে “নাস্তিক ব্লগার” রাজীবের সম্পর্ক আর সেই আন্দোলনে সরকারের সহযোগিতা থাকায় [সাথে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মিডিয়া] এদের সবার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠলো কিছু ঈমানদার মুসলমান, যাদের দায়িত্ব [স্বপ্নে পাওয়া] বাংলাদেশ থেকে নাস্তিক নির্মূল করা, উপায় হলো ফাঁসি।

জাতি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর একদিন পর, ২২শে ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ আক্রমন শুরু হয় ঢাকার বায়তুল মোকাররম থেকে।

জুম্মা’র নামাজের অনেক আগেই, সাড়ে ১১টার দিকে, আস্তিকরা মসজিদে ঢোকা শুরু করে। দলে দলে মিছিল নিয়ে আসে তারা, ব্যানার তেমন চোখে পড়েনি, তাই সহজে বুঝা যায়নি কারা এরা! তবে এরা ক্ষুদ্ধ ছিল পুলিশের উপর [মোটামুটি নভেম্বর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবীতে পুলিশের উপর হামলা শুরু করে জামায়াত-শিবিরের সমর্থকরা] কেননা বায়তুল মোকাররমের চারপাশে পাহারা বসানো হয়েছিল। মসজিদে যারা ঢুকছিল তাদের তল্লাশি হচ্ছিল। বাকবিতন্ডাতেই মিটে যায় তখন।

কিন্তু সাংবাদিকদের উপর প্রথম হামলা করে কিছু “আস্তিক”, যাদের বক্তব্য ছিল সেইসব সাংবাদিকদের টিভি-পত্রিকা শাহবাগের আন্দোলনের পক্ষে অর্থ্যাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ, জামায়াতী প্রতিষ্ঠান বর্জনের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করছিল, মানে নাস্তিকদের সহযোগিতা করছিল।

আর নামাজ শেষ হবার পর শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমন। তবে নিয়মমাফিক খুৎবা দিতে পারেন নি ইমাম সাহেব, তার মাইক কেড়ে নেয়া হয়েছিল। কারা-কিভাবে তা করেছিল অনুমান করে নিন। রাজীবের আত্মার শান্তি কামনায় সেদিন দোয়া করার কথা ছিল।

বাইরে এসে শান্তিপূর্ণ মিছিলের নাম করে ব্লগারদের ফাঁসির দাবীতে সেইসব আস্তিকেরা কয়েক ঘন্টার সংঘর্ষে লিপ্ত হয় পুলিশের সাথে। এ ধরনের ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল সাংবাদিক আর পুলিশরা, ফলে “আস্তিকদের” কর্মকান্ড টিভিতে সরাসরি দেখতে পারে জনগন। দেখা গেলো কিভাবে মসজিদের ভেতরের দেয়াল ভেঙ্গে ইট বের করে পুলিশের দিকে ছোঁড়া হলো, পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ায় মসজিদের ভেতর আগুন জ্বালানো হল।

কর্মতৎপর সাংবাদিকতার কারনে আরো জানা গেল দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের গনজাগরনমঞ্চের উপর হামলা করেছে নবীপ্রেমী-আস্তিক-ঈমানদার মুসলামনরা, ভেঙ্গেছে শহীদ মিনার, নষ্ট করেছে বেদীতে রাখা ফুল, ভেঙ্গেছে ভাস্কর্য, জাতীয় পতাকায় আগুন দিয়েছে। ব্লাসফেমী আইনটাই তখন তাদের একমাত্র দাবী ছিল, তবে তার প্রকাশভঙ্গী ছিল শিবিরের মাথাগরম সন্ত্রাসীদের মত।

সরকারবিরোধীদের মুখে হাসি ফুটলো, শাহবাগের নাস্তিক তথা জামায়াত-শিবিরবিরোধী তথা রাজাকারবিরোধী তথা সরকারের বিরুদ্ধে একটা শক্ত কিছু দাঁড় করাতে পারলো তারা। যদিও শুরুটা ভালো হয় নি – শান্তির ধর্ম প্রতিষ্ঠার কথা বলতে গিয়ে নিজেরাই লাখো জনগনের অশান্তি ও সাধারন ধর্মভীরু মুসলমানের অস্বস্তির কারন হলো। এসব তো রাজনীতিবিদদের কাছে ব্যাপার না। সত্য-মিথ্যার মিশেল দিয়ে অনবরত চেষ্টা করেও বিরোধী জোট শাহবাগের আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারছিল না। এমনকি নাস্তিক প্রসংগ টেনেও বিশেষ ফায়দা হলো না।

তাই ইস্যুটাকে বাঁচিয়ে রাখতে জামায়াত-বিএনপি তাদের জোটের অন্যান্য ইসলামিক দল ও আগাছা সংগঠনকে কাজে লাগালো। একের পর এক সভা চলতে লাগলো। অবশেষে, ৫ই মার্চ গলা খাঁকারি দিলো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এদেরকে আগে দেখা গিয়েছিল নারী নীতি ও শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে বায়তুল মোকাররম ও চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হয়ে মিছিল করতে। দাবী প্রকাশের ধরন বুঝে নিন।

এবার দেখা গেলো “রাজাকারের ফাঁসি”র বিপরীতে “ব্লগারদের ফাঁসি”র দাবীই আস্তিকদের একমাত্র দাবী নয়; এদের ১৩-দফার শুরুটা হয়েছে সংবিধানের মূলনীতিতে “আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” পূনঃস্থাপন আর কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সকল আইন বাতিল করা নিয়ে। পরের ৪টি দাবী অবশ্য শাহবাগের আন্দোলনে নিয়ে ঘোঁট পাকানোর জন্য যথেষ্ঠঃ ধর্ম অবমাননাকারীদের মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে সংসদে আইন পাশ, শাহবাগ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নাস্তিক-মুরতাদদের কঠোর শাস্তি প্রদান এবং [শাহবাগে] নারীদের অবাধ চলাফেরা-মোমবাতি জ্বলানোর মত বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।

দাবীগুলোর যথার্থতা নিয়ে কথা বলার আগে বুঝা দরকার কারা-কেন-কখন-কিভাবে এসব দাবি তুললো। এসব দাবী আর ইতিমধ্যেই কারা তুলেছে সেটাও হিসাবে নেয়া উচিত; অরাজনৈতিক-আস্তিক মুসলমানরা কেন এসব দাবীতে ভয়ংকর রূপ নিয়ে রাস্তায় নেমে এলো; আর কেনই বা তাদের মিছিল-লংমার্চ-সমাবেশে সরকারবিরোধী ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের কর্মকান্ড চোখে পড়ে আর সেইসব প্রতিবাদে [না আক্রমনে] জ্বালানী সরবরাহ করে ইকোনোমিস্ট, আল-জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট বা ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল; দেশের কিছু আওয়ামীবিরোধী কেন জামায়াত-শিবির আর হেফাজতের [অবৈধ-অনৈসলামিক] দাবী নিয়ে রাস্তায় নামাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে…

আরো বুঝা দরকার? হেফাজতের ঘাঁটি হলো হাটহাজারি আবাসিক মাদ্রাসা, যাদের শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই নানা সময়ে অশান্তি সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মার্চের শেষদিকে এদের কমিটিতে দেখা যায় প্রায় সবাই ১৮-দলীয় জোটের নেতা, আর হুমকি-ধামকীর ধরনও “খবর আছে” টাইপের।

লংমার্চ উপলক্ষ্যে হেফাজতী জোট ও সরকার নানা রং-তামাশা দেখালেও শেষ পর্যন্ত কলঙ্কের কালি লাগলোই। সাংবাদিক নির্যাতন-শাহবাগের মঞ্চের উপর হামলা, পুলিশের উপর বোতল ছুঁড়ে মারা ইত্যাদি চললো; আর মতিঝিলের ৪০লাখ [জামায়াতের নেতাদের আইনজীবী তার অফিসিয়াল বক্তব্যে একাত্তর টিভিতে বলেছিল] ঈমানদার মুসলিমদের নবীপ্রেমী-আস্তিক নেতারা মুখে যা বললেন তা আর লিখতে চাই না।

সেইসব নোংরা কথা, যা শুনতে “খাইয়া ফালামু” টাইপ শোনায়, এখনও চলছে।

২৯শে এপ্রিলঃ রাজশাহীর জনসভায় হেফাজতের নেতারা বলে ৫ই মে’র ঢাকা অবরোধ কর্মসূচীর আগে সরকার দাবী না মানলে “সরকারপতন আন্দোলন” শুরু হবে, যেই ঘোষনা বিএনপির প্রধান সম্প্রতি দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু দলের শীর্ষ নেতারা জেলে থাকায় ও সাংগঠনিক শক্তি দূর্বল থাকায় তা পারছেনা বিএনপি ও তার চালিকাশক্তি জামায়াত-শিবির। এমনকি এই জনসভায় ঘোষনা দেয়া হয় আস্তিক হেফাজতী মুসলিমরা সেই দলকেই সমর্থন দেবে যারা তাদের দাবী মেনে নিবে [সরকার লংমার্চের পর থেকেই হেফাজতের দাবীগুলোকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিচ্ছে]।

২৬শে এপ্রিলঃ লালবাগের আজাদ বালুর মাঠের জনসভায় হেফাজতীরা হুমকী দেয় অবরোধের আগে দাবী না মানা হলে বংগভবন দখল করবে তারা; ৬তারিখ থেকে দেশে সংবিধান থাকবে না, কোরআনের আইনে দেশ চলবে; প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য নাস্তিকেরা এই দেশ ছেড়ে পালাতে পারবেনা, এদের বিচার হবে; সাভারের ভবনধ্বস আল্লাহর গজব কারন ২৭শে এপ্রিল নারীদের মহাসমাবেশ ডাকা হয়েছিল; এরকম গজব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয় ও বংগভবনেও পড়বে!

সাভারের ভয়াবহতার কারনে সরকারের কোন মন্ত্রী-এমপি হেফাজত নিয়ে বক্তব্য না দিলেও আইনশৃংখলাবাহিনী যে কাজ করছে তা অনুমান করা যাচ্ছে। সচিবালয়ে সোমবার মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক থাকতে বললেন হেফাজতের বিষয়ে; তার মতে হেফাজত যা করছে তা “ঔদ্ধত্য”।

আমার মতে এসব আচরনকে শুধু “ঔদ্ধত্য” বলে ছেড়ে না দিয়ে দ্রুততম সময়ে এসব ধর্মের লেবাস পড়া তথাকথিত আস্তিক-নবীপ্রেমীদের গ্রেপ্তার করুন-রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে বিচার নিশ্চিত করুন।

হেফাজতের ১৩দফা, সরকারের বক্তব্য

 

সরকারের অবস্থানের পর হেফাজতীদের ১৩দফার ব্যাখ্যা

১৩ই এপ্রিল সংশোধিতঃ

 

১২. অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত সকল আলেমওলামা, মাদরাসার ছাত্র, ইমামখতীব তৌহিদী জনতাকে মুক্তিদান, দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

১৩. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

 

Advertisements