এমনিতেই দেশের প্রায় সব এলাকায়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, বিভিন্ন প্রকার খোলা খাবার যেমন ফল, মাছ, মাংস, দুধ, মসলা ইত্যাদিতে অবাধে ফরমালিন, কার্বাইড, সার, কাপড়ের রং ইত্যাদি নানা রকমের রাসায়নিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হচ্ছে; তখনি খবর আসলো সরকারের মাননিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই ৩১টি কোম্পানির ৪৩টি পণ্যের লাইসেন্স বাতিল করেছে।

এ ধরনের উদ্যোগ খানিকটা স্বস্তিদায়ক হলেও এতদিন আমরা কি খেয়েছি তা ভেবে শংকায় মাথার চুল সব পড়ে যাবার অবস্থা।

বিশেষ করে যখন দেখা গেলো সেই তালিকায় প্রাণ ও হক ব্রাদার্সের মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম আছে, একটি জনপ্রিয় ফলের জুসও আছে, কয়েকটি কোম্পানির ধনিয়া গুড়া, চাটনি এবং সেমাই আছে তখন সবার আগে শিশুদের কথা মনে করে শিউড়ে উঠে গা।

হ্যা, দু:খজনক হলেও সত্য। ছোট সাদা বোতলে প্রাণের ফ্রুট ফ্লেভারড ড্রিংকস-এর লাইসন্স বাতিল করেছে সরকার। বলা হয়েছে এসব ড্রিংকসে যেসব ফলের নাম লেখা থাকবে তার কমপক্ষে ১০ভাগ উপাদান থাকতে হবে।

কিন্তু বিএসটিআই এ মাসের ১৩ তারিখে যেই ১৪টি ব্র্যান্ডের ড্রিংকসের লাইসেন্স বাতিল করেছে সেগুলোতে সেসব ফলের কোন উপাদানই ছিল না!

প্রাণের দাবি তারা তাদের ড্রিংকসগুলো বাজার থেকে সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

এর বিপনন পরিচালক কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান যে তাদের নাকি এই পণ্যের জন্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিলনা। তাই তারা সিনথেটিক জুস তৈরি করে যাচ্ছিলেন। বিএসটিআই নাকি সম্প্রতি এই বিষয়টি আরোপ করেছে।

এইটা একটা ভুয়া দাবি, কেননা বিএসটিআই বলছে তারা অনেক আগেই কোম্পানিগুলোকে সাবধান করে চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু কোন জবাব পায়নি।

তবে বিএসটিআইকে সাধুবাদ দেবার পাশাপাশি এর দূর্বল পর্যবেক্ষন ও আইনী ব্যবস্থা নেয়ার শিথীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই। এর উত্তরটা যদিও আমার জানা আছে: আমাদের ইচ্ছা আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবল নেই।

আর এই সুযোগেই চামবাজ ব্যবসায়িরা জনগনের স্বাস্থ্য সমস্যাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর মুনাফা কামাচ্ছে।

সম্প্রতি বিএসটিআই ভারতের কাছ থেকে বিশ্বমানের পণ্য যাচাই করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। হয়তো তারপরেই বিএসটিআই-এর পরীক্ষন কার্যক্রম আরো কঠোর হয় এবং এই ৪৩টি পণ্যের লাইসেন্স বাতিল করে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য হূমকিস্বরূপ সবকিছু নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর সেই কাজে সরকার ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব সর্বাপেক্ষা বেশি। পাশাপাশি সুশিক্ষিত জনগনের উচিত বাকি জনগনকে ভেজাল খাবারের বিষয়ে সচেতন করা।

এক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায় যেখানে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর কারনে দায়ি ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আইন আমাদের দেশে অনেক আছে, নেই শুধু যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সময়মত তার ব্যবহার।

প্রথম আলোর সুবাদে পাওয়া ১৩ই অক্টোবর বাতিল হওয়া পণ্যগুলো হলো:
১- প্রমি লিচু ও অরেঞ্জ জুস
২- মডার্ন ফ্রুট জুস
৩- নিউট্রি অরেঞ্জ জুস
৪- সাফা কোম্পানির রকস্টার ফ্রুট ড্রিংকস
৫- ফাস্ট্র্যাক কোম্পানির চাটনি কিউসি
৬- মডার্নের চাটনি
৭- এলিট চাটনি
৮- সেজানের তেতুল চাটনি
৯- জে কে এগ্রো প্রোডাক্টসের সিনথিয়া চাটনি
১০- ইবনে সিনা চাটনি
১১- স্বর্ণা চাটনি
১২- হক ব্রাদার্সের ওয়েফার বিস্কুট অরেঞ্জ ক্রিম
১৩- হকের চকোলেট ক্রিম
১৪- হকের কোকোনাটি এলমন্ড ও হানি
১৫- হকের ট্রটি ফ্রুটি
১৬- হকের ডিংডং
১৭- এংকর ওয়েফার বিস্কুট
১৮- মায়ের অনুদান কোম্পানির জান্নাত ধনিয়া গুড়া
১৯- প্রক্সিমা কোম্পানির পিপিএল ধনিয়া গুড়া
২০- নরসিংদী সিটির ধনিয়া গুড়া
২১- এমএমএইচ কোম্পানির বাবু ঘোষাল ধনিয়া গুড়া
২২- আরপিএম এর ফ্রুট জুস
২৩- আরা ফুডসের ফ্রুট জুস
২৪- সিটিজি কোম্পানির গৃহিনী ধনিয়া গুড়া
২৫- রংধনুর ধনিয়া গুড়া
২৬- টিএম কোম্পানির আজ্জ ধনিয়া গুড়া
২৭- রহমতউল্ল্যাহ কোম্পানির রান্না ধনিয়া গুড়া
২৮- বিএসপি ফুডসের কুকমি ঘি
২৯- পদ্মা ইলেকট্রিকের স্ট্যাটিক আওয়ার মিটার
৩০- ঢাকা ফুডসের ডায়মন্ড সেমাই
৩১- আলাউদ্দিনের সেমাই
৩২- সার্স ফুডসের সেমাই নুরী
৩৩- মায়া চানাচুর কোম্পানির মদিনা সেমাই
৩৪- শাহানা কোম্পানির লাবনী সেমাই

আপডেটঃ

প্রাণের মোট ৮টি পণ্যের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে সেগুলো হলোঃ প্রাণ টোস্ট বিস্কুট, টি-ব্রেক, চানাচুর, ম্যাংগো বার, চাল, ঝাল মুড়ি, চিড়া ভাজা, চিড়ার লাড্ডু, পটেটো ক্র্যাকার্স ও মাস্টার্ড অয়েল। সূত্র: শেয়ারনিউজ২৪/ডব্লিউএন/১৪৩০ঘ.

নভেম্বর ৪ তারিখে হাইকোর্টে করা রিট অনুযায়ীঃ প্রাণের ম্যাঙ্গো, অরেঞ্জ, লেমন, স্ট্রবেরি, লিচি, আপেল, পাইন আপেল ও ফ্রুট ককটেল নামে বোতলজাত পানীয় এই রুলের আওতায় পড়বে।