৩২-এ এসে একটু থেমে… পুরনো গল্প বলা


আরেকটা বছর গেলো গিয়া কোনদিক দিয়া, টেরই পাইলাম না, ৩২ শুরু হইলো, বড় হইয়া যাইতাছি দেখি।

তবে আমার কাছে জন্মদিনে সবচেয়ে সুখের কথা হইলো “এতকিছুর মধ্যেও এখনো বাইচা আছি”। ভালোই তো। আমি এইদিক দিয়া ভাগ্যবান।

আজকে আমার ফেলে আসা দুরন্ত ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়তাছে–আমার গ্রাম, ঘর, বাবা, দিদি-দাদা, আত্মীয়রা, মাঠ আর মাঠ, রেললাইন, খেলার সাথীরা, নাটক-গানের দলের অনুষ্ঠান, এরশাদবিরোধী আন্দোলন;

পরে ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন স্কুলের কড়া শাসন, অজিত স্যারের কাছে সব সাবজেক্ট আর রতন মজুমদারের কাছে অংক পড়া, গাংগিনারপাড়ের ব্যস্ততা, গলিতে ক্রিকেট, ব্রহ্মপুত্র নদীতে ঝাঁপ, পাবলিক লাইব্রেরি, সার্কিট হাউজ মাঠ আর সাহেব পার্ক, কাচারিঘাটে জমির ভাইয়ের চা, টিটিকলেজে (বাতিরকলের) ইঁচড়েপাকা আড্ডা, আহা…

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সেই স্বপ্নীল দিনগুলি, জানালা দিয়ে ক্লাস ফাঁকি দেয়া আর জীববিজ্ঞান ক্লাসে সামনে দিয়েই পলায়ন, নারিকেল বাগানে ক্রিকেট-ফুটবল-তাস-আর ধোঁয়া, নৌকায় করে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া, কলেজের আরেক পাশের রেললাইনে আড্ডা আর তাস খেলা, ভার্সিটির বাসে করে বা ট্রাকে ‘শহরে’ ফেরা, বাবা ঢাকায় চলে গেলে পরে কলেজ রোডের সেই দূর্বিষহ ‘মেস লাইফ’ যেখানে শান্তি ছিল রেললাইন আর ছাদে শুয়ে পরিষ্কার আকাশে তারা-উল্কা দেখা আর টপটেন-এ সুখটান, আহ…

তারপর ঢাকায় গিয়া হুদাই ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করা, ডাক্তারি পরীক্ষা দেয়া, বাবার অমতে শখ করে ঢাবি’র সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়ে নতুন পৃথিবীর দিকে ছুটে চলা, টিএসসি’তে টেবিল টেনিস, ক্যারম, নন-স্টপ তাস খেলা আর চা-সমুচা, প্রিয় মনোবিজ্ঞানে মাইগ্রেশন…

কিন্তু তখনি জাহাঙ্গীরনগরের ফল দিয়ে দিল, আর বাবা যেন কিভাবে তা জেনেও গেল যে আমার বিবিএ’তে হয়েছে অপেক্ষমান তালিকায়, লুকাতে পারলাম না, তাঁর ঠেলাঠেলিতে সেখানেই ক্যাম্প গাড়লাম, কিন্তু মুহুর্তেই টের পেলাম এখানেই আমার আসার দরকার ছিল, আগে, অনেক আগে…

কিন্তু আমার ‘বিদেশি’ বিভাগ জাবি ক্যাম্পাসের সাথে খাপ খায় না, এরা অন্যরকম, বিবিএ আমার জন্য না, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে, তাই ভদ্রভাবে-মাথা ঠান্ডা রেখে মানিয়ে নেয়ার বিফল চেষ্টা, অতঃপর শিক্ষাগ্রহন বর্জন…

কিন্তু ক্যাম্পাসকে তো বর্জন করতে পারিনা! অসম্ভব! আমি ততদিনে আটকে গ্যাছি এক মায়া’র আঠায়, কি যেন আছে ক্যাম্পাসে, শতশত ব্যাচমেট, বড়ভাই, ছোটভাই, আল-বেরুনী এক্সটেনশনের পাকা ক্রিকেট গ্রাউন্ড, বস ট্রান্সপোর্ট, প্রিয় দোকানদার, খালা-জাহাঙ্গীর-মাজেদারা, কালু-নুরু-মোস্তফা, রিক্সাওয়ালা-বাসের মামারা, ওস্তাদ তারা ভাই, পাংখা নুর ইসলাম, বিরক্তিকর আলি, অমর একুশে, সেন্ট্রাল মাঠ, ক্যাফেটেরিয়ার ঢাল, সিঁড়ি, মুক্তমঞ্চ, টিএসসি, এমএইচ যাবার সরু রাস্তাটা, সমাজবিজ্ঞানের পেছনের জঙ্গল, রেজিস্ট্রার বিল্ডিং-এর সুইজারল্যান্ড, পোস্ট অফিসের পিছে, তেতুল তলা, জাকসুর বারান্দা-লেকপাড়, পুরান কলা চত্তর, বিশ-মাইলের ঢাল, অতিথি পাখির পাগল করা কীর্তিকলাপ, রাজকুমারের সাথে ঘুরে ঘুরে সাদাকালো ছবি তোলা শেখা আর এক্সপিরিমেন্ট, পিন্টু ভাইয়ের সাথে মাছ ধরা, কামালউদ্দিন-আলবেরুনী-বঙ্গবন্ধু, ১নম্বর-২নম্বর-জাহানারা-প্রীতিলতার ছেলে-মেয়ের সাথে অত্যাধিক খাতির, মাঝরাতে বাঁশি বাজাতে, গান গাইতে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়া, আল-বেরুনীর টিভিরুমের খেলা দেখা আর টেবিল টেনিস-ক্যারম, যদিও কামালের টেবিল সবচেয়ে ভালো ছিল কারন দূর থেকেও খেলা যেত, সেখানে প্লেয়ার বেশি হলে আমরা লীগ করে খেলতাম, আর ক্লান্ত হয়ে শেষে কালু ভাইয়ের চা খেয়ে কমন রুম-৪৪৮-১০১-২৫২ তে দে ডুব😀

২০০৫-এর নভেম্বরে মনে হয় হল ছাড়লাম, তারপরও ক্যাম্পাস ছাড়তে পারলাম না, গেলাম বঙ্গবন্ধু-আল বেরুনী, ২০০৭-এর অক্টোবর-নভেম্বের গেলাম আমবাগান, উঠলাম তারা ভাইয়ের বাসায়, নিজের একটা রুম, টিনশেড বাসা, পাশের ঘরে এক দম্পতি থাকতো, ওস্তাদের সাথে গোপন-তারছিড়া আড্ডা, আমবাগান কিন্ডারগার্টেনে ৩মাস বাচ্চাদের মাস্টারি করা, পুচকুগুলা মজা পেয়েছিল, আমিও, কিন্তু টাইমিং হলো না অন্য দিকে, ছেড়ে দিয়ে আবার রিসার্চের কাজ, একটা নোয়াখালীর ফড়িয়ার সাথে জাপানী স্বপ্নে ৩মাস বেগার খাটা, তারপর…আর না…অপ্রতিরোধ্য নেশা ছেড়ে যান্ত্রিক নগরে আস্তানা গাড়তে ২০০৮-এর শেষে লালমাটিয়াতে…

শ্রেষ্ঠাদের বাসায় অনেকদিন থাকলাম, অদ্ভুতভাবে কাটে সময়, ২০০৯-এর জানুয়ারিতে শুরু হলো আমার অন্যরকম পথ চলা, এমন একটা কিছু যা আমার মনে হলো আমাকে ব্যস্ত রাখতে পারবে, আর আমিও আঠার মতো আটকে যাবো, হ্যাঁ, তাই হয়েছে, ২টি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিলেও আমি এখনও সংবাদ নিয়েই আছি, ভাবছি, লিখছি, বলছি এবং নিজেই নিজের লেজে আগুন ধরিয়ে দৌড়াচ্ছি…

আর যতদিন বাঁচি, যতটুকুই সম্ভব, দৌড়ের উপর বাঁচতে চাই, সবার সখ্যতা-ভালোবাসা নিয়ে-আর ভালোবেসে…

আপডেট ১: সেই ক্যাম্পাসের সোনাঝড়া দিনগুলির আরো কিছু কথা বাকি রয়ে গেল–সেখানে আমি ঘুরে-ফিরে জীবনের কঠিনতম সময়ে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছি, দেখেছি বারো রকমের মানুষ, দেখেছি তাদের চলন-বলন-গড়, দেখেছি বাতাসে পাতার দোল খাওয়া, লেক-পুকুরের পানির স্বচ্ছতা-শাপলা, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল, রেইনট্রী ফুল, জারুল, বাগানের অজস্র ফুল…

কথা বলেছি-আড্ডা দিয়েছি আমার প্রিয় পল্টু, টাইক, মাইক, টাইগার, মাইলো, মালেক, আরো অনেক নাম না রাখা কুকুরের সাথে, পল্টুর সাথে ট্রান্সপোর্টে খেলতে গিয়ে কতদিন যে ঢাকা যেতে পারিনি তাঁর হিসেব নেই, টাইকের অত্যাচারে অনেকেই যখন বিরক্ত বাবার মত ওকে আগলে রেখেছি, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারিনি ভদ্রলোক নামধারী কুকুর-বিদ্বেষী শিক্ষকদের কারনে, কমপক্ষে ৭৮টি কুকুরকে মেরে ফেলা হয় কেরসিন ইনজেক্ট করে, অথচ ক্যাম্পাসে পাগল-অসুস্থ ককুর ছিল মাত্র ৩/৪টা…

আরও অনেক কিছুই মনে পড়বে, আবার লিখবো, আমি কৃতজ্ঞ সবার কাছে তা আবার বলতে চাই।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s