নাটের গুরু

অনেকদিন ধরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আটক জামায়াত ও বিএনপি নেতারা ফুঁসছেন তাদের বিচার হচ্ছে বলে; আর বাইরে থেকে জামায়াত ও বিএনপি’র নেতারা একাট্টা হয়েছেন এর বিরুদ্ধে। এরা যুদ্ধাপরাধী না, এরা দালাল; এরা রাজাকার না, এরা পাকিস্তান ভঙ্গের বিপক্ষে ছিলেন শুধু। 

যুদ্ধাপরাধীই বলুন আর মানবতার দায়ে অভিযুক্তই বলুন এরা এদেশের শত্রু। 

এমনিতেই জোটের শরিক দল, তার উপর আবার একই সাথে বিচার হচ্ছে—সুতরাং সুর না মিলে যায় কই? এই বিচার প্রহসনের, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত (কি সব কঠিন কঠিন শব্দ সবাই ব্যবহার করে, তাও আবার বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে!) এটা বাতিল করতে হবে। এই বিচারের রায় আগেই ঠিক করা আছে। (ফাঁসির ভয়ে উনাদের মাথা খারাপ অবস্থা)

আগে মনে ছিলনা? স্বাধীন হবার পরেও এরা কোন সাহসে দেশে থেকেছে? তাদের দেশ পাকিস্তানে চলে যায়নি কেন?

সুবিধার আশায়; কেননা বিচার যাওবা শুরু হয়েছিল, তা তো বঙ্গবন্ধু খুনের পর থেমেই গেল (পাকিস্তানের ১৯৫ সেনার বিচার মওকুফ করা হয়েছিল আগেই, তারপর বিচার হচ্ছিল রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের)। দালাল আইন বাতিল হলো, এনারা বহাল তবিয়তে রাজনীতিতে-সমাজে-রাষ্ট্রে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগিলেন। এবং বেশিরভাগই হলেনও। রাষ্ট্র যখন মদদ দেয় তখন ঠেকায় কে?

সেই জিয়া থেকে শুরু করে এরশাদ-খালেদা-হাসিনা সবাই নানা সময়ে এদের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আর দেশের মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। রাজনীতিবিদদের যে চামড়া মোটা সেটার এরকম আরো ভুরিভুরি প্রমান মেলে আমাদের দেশে।

প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে, সাথে ছিল হাজারো জনতা। এরা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে, ক্ষমতাবানদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গড়েছিলেন জনতার মঞ্চ। বিচার করেছিলেন মীরজাফরদের। কিন্তু আইনের চোখে এদের অপরাধ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।

অবশেষে নির্বাচনের আগে অঙ্গীকার করায় আওয়ামী লীগ এবার যথাযথভাবে বিচার শুরু করতে শুরু করে দিল, তাও আবার প্রায় দুইবছর পর। এর মধ্যে ট্রাইবুন্যাল হয়েছে, তদন্ত হয়েছে, তারপর একে একে গ্রেপ্তার শুরু হলো।

কিন্তু এই বিচার হতে পারে বুঝতে পেরে জামায়াত কি বসে ছিল? তারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে মোকাবেলা করে যাচ্ছে—বিএনপিকে দিয়ে মাঝে মাঝে নানা ছুতায় আন্দোলন-বিক্ষোভ করে যাচ্ছে সেই ২০০৯-এর বোধকরি জুনের দিক থেকেই। তাছাড়া দেশের নানা অবস্থানে থাকা সমমনা ব্যক্তিদের দিয়েও নানাভাবে এই বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এমনকি বিদেশ থেকে ভাড়া করা নানান কিসিমের তথাকথিত বিশেষজ্ঞ দিয়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন ১৯৭৩-এর ফাঁকফোকর বের করার চেষ্টা চলছে।

সম্ভবত এদের চাপে পড়েই খালেদা জিয়া বলতে বাধ্য হয়েছিলেন (একবারের জন্য) যে আটককৃতরা যুদ্ধাপরাধী না, এদের ছেড়ে দিতে হবে। যাই হোক, দেখলেন জনসমর্থন তেমন পেলেন না। তাই এই বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকলেন।

কিন্তু তাই বলে কি দলের সবাই চুপ থাকবে? বহুরূপী মওদুদ একদিন লিখিত বক্তব্য পড়ে এই বিচার বন্ধের দাবি জানালেন। যদিও পরে দল থেকে সংশোধন করা হয় এই বলে যে, ঐ লেখাতে নাকি বিচার বাতিলের কথা লেখা ছিলনা। এটা মওদুদ মিয়া ভুল করে বলে ফেলেছেন।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল অবশ্য পরে নানা জায়গায় বলেছেন তারা এই বিচার চান, তবে যেন তা স্পষ্ট, নিরপেক্ষ হয় এবং রাজনৈতিকভাবে কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়।

আমি ১৯৭১-এর এইসব মীরজাফরদের বিচারের পক্ষে, আমার দাবি এদের ফাঁসি হোক—তবে তা অবশ্যই আইনের আওতায় হতে হবে—যেন কেউ কোনদিন প্রশ্ন করতে না পারে। মেজাজ খারাপ থাকলে অবশ্য বলি ধুর বিচারের কি দরকার? রাজাকার-আলবদর-আলশামসরা কি হিসাব কইরা মারছিল নাকি আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবি আর সাধারন মানুষদের? ওরা তো শুধু হিন্দুদের মারেনি-ভিটেমাটি ছাড়া করেনি, অগনিত মুসলমানদের মেরেছে। আর পাকিস্তানীদের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা গুড়িয়ে দিতে আর তাদের সাহায্যকারীদের খুন করতে সাহায্য করেছে। লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষন করতে ওদের বুক একটুও কাঁপেনি। বাড়িঘর লুটপাট করে নিজেরা ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে।

আমার আফসোস, এদের ১৯৭৫ সালের আগেই কোর্ট মার্শাল করে মেরে ফেলার দরকার ছিল। তাহলে আজকে আমাদের দেশকে এখন এমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুতে হতো না। অনেক পিছিয়েছি আমরা এইসব স্বাধীনতাবিরোধীদের কূটচালের কারনে।

রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারনে বিএনপি এদের সঙ্গ ছাড়ছেনা, এটা আমার আরেকটা আফসোস।

সবচেয়ে বড় আফসোসটি হলো একটা কথা শোনা যায় অনেক যুদ্ধাপরাধী নাকি আওয়ামী লীগেই খুঁটি গেড়ে আছে বিচার থেকে রক্ষা পাবার আশায়। এর সত্যতা আমার জানা নাই, কেননা প্রমান নাই। কিন্তু অনেকেই দেখি বলে যাচ্ছে এই কথা।

এটা কি শুধুই গুজব? নাকি সঠিক? বিএনপি’র কোন কোন নেতা প্রকাশ্য বক্তৃতায় এই দাবি করেছেন।

কিন্তু জামায়াতও পর্যন্ত একজনের নাম বলতে পারলো না। এটা কি করে সম্ভব?

এমনকি গতকাল যখন ট্রাইবুন্যালে বিএনপি’র প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানীতে তখনও তার আইনজীবী একই দাবি জানালেন। কিন্তু কোন নাম বলতে পারলেন না। কথা এড়িয়ে যেতে গিয়ে বললেন এই বিচার পক্ষপাতদুষ্ট, প্রসিকিউশন দলীয়।

বিডিনিউজ থেকে উদ্ধৃতঃ

শুনানির এক পর্যায়ে তাজুল ইসলাম বলেন, “আমার মক্কেল বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণেই এই বিচার হচ্ছে।”

জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, “প্রসিকিউশন বলছে, সরকারি দলে কেউ নেই। আপনারা বলছেন, আছে। তাহলে দেখিয়ে দিচ্ছেন না কেন? সরকারি দলে কেউ থাকলে তাকে দেখিয়ে দেন। আবেদন না করলে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা কীভাবে বুঝবেন?”

আইনজীবী তাজুল বলেন, “এই বিচার যে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, সরকারি দলেও অনেক অপরাধী রয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, “ক্ষমতাসীন দলে যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধে (তদন্ত চেয়ে) একটাও আবেদন করেছেন কি?”

আইনজীবী তাজুল বলেন, “এটাতো সরকারেরই দায়িত্ব। এই বিচার তারা করছে। এটা নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে তাদেরই উচিত দল মত নির্বিশেষে সবাইকে বিচারের আওতায় আনা।”

“আমরা আবেদন করলে তো সেটা যাবে প্রধান প্রসিকিউটরের কাছে। তিনিই ঠিক করবেন, এর তদন্ত হবে কি-না। আর প্রসিকিউশন তো রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট,” আলীমের আইনজীবী বলেন।

এরপর তাজুল বলেন, এ ধরনের আবেদন করার বিষয়টি তারা ভবিষ্যতে ভেবে দেখবেন।

এইবার বুঝুন, কার দৌড় কতটুকু! আশা করি বিরোধীদল (জামায়াত ও বিএনপি) সুস্পষ্ট অভিযোগ এনে জাতিকে বাধিত করবেন।

১৯৭৩ সালের আইন নিয়ে যেসব ভুল ধরা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এমনকি রায় ঘোষনার পর আসামীদের জন্য রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করারও বিধান রাখা হয়েছে।

তথাপি, তদন্ত কমিটিগুলো ও প্রসিকিউশনের সদস্যদের অপরপক্কতার জন্য ইতিমধ্যেই অনেক দেরী হচ্ছে বিচারে। সে বিষয়ে অবশ্য সরকার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে ভুল করছে বলে আমার ধারনা। আরেকটি ট্রাইবুন্যাল করেছে, কিন্তু দেশের অনেক অভিজ্ঞ আইনজীবী-বিচারকদের সেখানে রাখা হচ্ছেনা।

মাত্র ৯ জনের বিচার করতে গিয়েই সরকারের/ট্রাইবুন্যাল হাঁপিয়ে উঠেছে। বাকি কয়েক হাজার দালালের বিচার কবে হবে?

দুশ্চিন্তা হয় এই সরকার আবার ক্ষমতায় আসার জন্য ইচ্ছে করেই এই বিচারের দেরী করিয়ে দিচ্ছে না তো? এতে করে জামায়াত-বিএনপি দলগতভাবে এবং বিচারের মুখোমুখি যারা তাদের ব্যক্তিগত সহচরেরা অনেক সময় পেয়ে যাবে সবকিছু উলট-পালট করে দেবার জন্য।

আমার ধারনা যেন ভুল হয়।

এইবার গোলাম আযমের পক্ষে ভারতের জামায়াত প্রধান

গোলাম আযম দিয়ে শুরু করা দরকার ছিল

‘বুদ্ধিজীবী হত্যা’র স্পষ্ট ও সুষ্ঠু তদন্ত চাই

Advertisements