মালোয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একটি সমঝোতা স্মারক সাক্ষর করেছে, আর এ মাসের শেষদিকে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের দলটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিবে, যোগাযোগ মন্ত্রীর বক্তব্য। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে ‘বিল্ড অপারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফার’ ভিত্তিতে এই সেতু নির্মাণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। (খবর বিডিনিউজের)

দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে ঢাকার সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারনে এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ দরকারি, আর আওয়ামী লীগের জন্য তো বটেই কেননা এটা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ছিল।

মুহিত বলেছেন সরকার পদ্মা সেতু্র অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে প্রস্তাবনা তৈরির কথা ভাবছে, বলেছেন সরকারই তা ভবিষ্যতে তদারক করবে, কোন প্রধান অর্থায়নকারি থাকবেনা। দুর্নীতির যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংক করেছে তা গ্রহনযোগ্য না, কেননা যেহেতু অর্থ আদান-প্রদান হয়নি, তাই এটাকে দুর্নীতি বলা যাবে কিনা এ নিয়ে তার সংশয় আছে। (খবর ডেইলি স্টারের)

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী বলেন তাই এই ব্রিজ মালোয়েশিয়ার টাকাতে হলেই ভালো, যদিও ব্যবহারকারিদের খরচ একটু বেশি দিতে হবে।

জানুয়ারিতে তিনি বিশ্বব্যাংকের উপর এতোই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে বলেছিলেন দুর্নীতি প্রমান করতে না পারলে ওদের টাকা নিবেন না উনি। তাছাড়া এরা অনেক শর্ত দেয় বলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হয় এরকমও বলেছিলেন। তার কথার ধরনে মনে হচ্ছিল বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ধোঁয়া তুলে টালবাহানা করছে।

বিশ্বব্যাংক গত সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দুইটি প্রতিবেদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে। কিন্তু কোনটির পরেই সরকার ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই ক্ষোভে যে সরকারের কিছু আসে যায় না তা উপরের বক্তব্যগুচ্ছ থেকেই বুঝা যায়। বিষয়টিকে বিশ্বব্যাংক খুবই গুরুত্বসহকারে নিলেও বাংলাদেশ সরকার তা সেভাবে দেখছেনা টাকা-পয়সার আদান-প্রদান না হবার কারনে।

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষে দুদক তদন্ত করছে, এবং প্রকল্পের মূল সেতু নির্মাণে প্রাকযোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে কোনো রকম দুর্নীতি হয়নি জানিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি ওই বিষয়ে তদন্ত শেষের ঘোষণা দেয় দুদক। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি বিশ্বব্যাংকেও দেওয়া হয়েছে। ওই তদন্তের বিষয়ে তারা দ্বি-মত পোষন করেনি।

তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে বলে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিডিনিউজকে বলেন।

পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এসএনসি-লাভালিন নামে যে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে-সেটি কানাডা ও যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট ভেনচার। তাদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে কানাডীয় পুলিশের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।” তবে এখন পর্যন্ত দুদক কোনো জবাব পায়নি বলে জানান সাহাবুদ্দিন।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩ শ’ কোটি টাকা। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মূল্যায়ন কমিটি পরামশর্ক হিসেবে যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম সুপারিশ করেছিল, তার প্রথমটি ছিল এসএনসি-লাভালিন।

দাতা সংস্থাটির অভিযোগ প্রাক্তন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন এবং সরকারে ও বাইরে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কানাডার এসএনসি লাভালিনকে পরামর্শক হিসেবে কাজ পাইয়ে দেবার কথা বলে কমিশন চেয়েছিল। আর তিনি ও তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সাঁকো ইন্টারন্যাশনাল এই প্রকল্পে কাজ দেবার জন্য নীরব (পর্দার আড়ালের) এজেন্ট হয়ে কাজ করবে বলে বিভিন্ন কোম্পানীকে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দুর্নীতির ধারনা নিয়ে বাংলাদেশ ও উন্নত বহির্বিশ্বের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। মানে যে রাজনৈতিক সরকার, তার পরিচালিত প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গ, বেসরকারি খাত, নানান সেবাখাত ও সমাজ ইত্যাদি আতঙ্কজনকভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে তারা বলতে চায় কেউ টাকা-পয়সা নেয়নি, চেয়েছে সেটাও কেউ দেখেনি, তাহলে আর দুর্নীতি হলো কোথা? আর বিশ্বব্যাংক যারা ২৯০ কোটি ডলারের ১২০ কোটি দেবার কথা তাদের মতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ন ইস্যু।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ভাবছি, আবুল হোসেনের এত ক্ষমতা কোথা থেকে আসলো? এই লোকটাকে তো আগে চিনতামই না, তার উপর এত বড় ও গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রনালয় কিভাবে পাইলো? তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসার পর থেকে সে যেভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে চাইছে তাতে আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় বিশ্বব্যাংক ভুয়া বা খুচরা (বাংলাদেশ সরকারের চোখে) ঝুট-ঝামেলা নিয়া প্যাঁচাইতেছে।

কিন্তু বাজারে যেসব গুজব শোনা যায় মানে আবুল মন্ত্রীত্ব কিনে নিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর বোন রেহানার কাছ থেকে, যাকে নিয়মিত মাসোহারা দেয় আবুল। তাছাড়া এই ব্রিজের কাজ শুরু হলে নাকি (মানে তহবিল আসলে) আবুলের একটা ভালো অংকের টাকা দলের প্রধানমন্ত্রীকে দেবার কথা অনেক আগেই পাকা হয়ে আছে। তাই প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তার পক্ষ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ-তদন্তকে পাশ কাটিয়ে, নিজেদের তদন্ত শেষ না করেই মালোয়েশিয়া-চীনের সাথে আলাপ শুরু করে দিলেন!

কিন্তু এটারও কোন প্রমান আমার হাতে নাই। তাহলে, আসলে কি ঘটেছিল?

আরেকটি মহল মনে করে মাইনাস-টু ফর্মুলার নেপথ্য নায়ক প্রফেসর ইউনুস নাকি বিশ্বব্যাংকের কাছে নালিশ করে এই হাল করেছেন। কেউ কেউ বলে পদ্মা সেতুর কাজ হতে না দেয়া বিএনপির নির্বাচনপরবর্তী প্রধান এজেন্ডা।

তাছাড়া এও শোনা গেছে যে বিশ্বব্যাংক মানে আমেরিকা নাকি এই সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায়না। তাই এর সম্মানহানির জন্য যাবতীয় কর্মযজ্ঞ করে যাচ্ছে। যেমন, হিলারি সেদিন এসে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নিয়মিত বৈঠক ছাড়া আর কোন সুবিধা-সহযোগিতার (শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানী ইত্যাদি) কথা বলেননি, বরং শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের গুম-খুন, ইলিয়াসের গুম, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তত্বাবধায়ক ইস্যুতে অচলাবস্থা, গ্রামীন ব্যাংক ও ইউনুসের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ ইত্যাদি নিয়ে উদ্দ্বেগ প্রকাশ করে গেলেন।

কেউ কেউ বলছে ভারত নাকি এখানে একটা বড় প্রভাবক… ক্যামনে কি? কোনটাই তো প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না! তাহলে কাহিনীটা কি? আপনাদের মাথায় কিছু আসলে বলেন (যদি আপনি চিন্তিত হন)। আর কতদিন লাগবে সরকারি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য প্রকাশ হতে? এই আমলে কি তার দেখা পাওয়া যাবে?

Advertisements