This slideshow requires JavaScript.

বনানী ব্রীজ বস্তির ছবিঃ প্রথমটি তোলা হয়েছিল ২২শে জুলাই ২০১০; ২-৬ ৫ই আগস্ট একই বছর; ৭ ও ৮ ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১১; ৯ আর ১০ ৫ই জানুয়ারি ২০১২; ১১-১৩ ১৯শে জানুয়ারি; এবং ১৪ থেকে শেষ পর্যন্ত তার ২দিন পর তোলা 

ধিক সব সরকারি চাকুরেদের (প্রজাদের সেবাদানকারি) যারা দলীয় বিচারপতিদের অমানবিক আদেশকে পালন করতে গিয়েছিল সেদিন, বস্তির কাউকে আগে থেকে না জানিয়ে।

এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে ওদের উদ্দেশ্য ছিল যেন বস্তিবাসীরা প্রতিবাদ না করতে পারে! যেন ওদের সমূলে উচ্ছেদ করা যায়। যেন এইসব নোংরা মানুষগুলোকে (যারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে, গার্মেন্টসে কাজ করে, রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, আর মেহনতি মানুষ) আর দেখতে না হয় গুলশানের আলিশান বাড়িগুলোর অদূরেই।

শুনেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবা বঙ্গবন্ধু খ্যাত শেখ মুজিবর রহমান নাকি ‘মেহনতি মানুষের’ কথা বলতেন! সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!

হাইকোর্টের আগের নির্দেশনা অনুযায়ী পূণর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই সরকার যে অন্যায়ভাবে গুড়িয়ে দিল প্রায় ২০০০ ঘর, খোলা আকাশের নিচে যেতে বাধ্য করলো কড়া রোদ আর পরের বৃষ্টির মধ্যে — তা নিয়ে কয়টি প্রতিবেদন হয়েছে, হচ্ছে পত্রিকা আর টেলিভিশনে?

অথচ বস্তিবাসীরা এই অমূলক উচ্ছেদ ঠেকাতে যখন সড়ক অবরোধ করলো তখন সংবাদ মাধ্যম আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বড় বড় প্রতিবেদন করলো রাস্তায় মানুষের কত কষ্ট হয়েছে সেটা নিয়ে। বাহ! খবর প্রচারের ধরণটা ছিল এমন যে এমন অমানবিক কাজ কিভাবে করতে পারলো কড়াইলের বস্তিবাসীরা??? কত মানুষের কষ্ট হয়েছে রাস্তায়, অনেকেই সময়মতো কাজে যেতে পারেনি, এইচএসসি পরিক্ষার্থীরা বাসায় ফিরতে দেরি করেছে, স্কুলে যাওয়া-আসা করতে পারেনি কেউ কেউ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া তথ্যগত ভুল (ইচ্ছাকৃত ও অযোগ্যতার কারনে) তো ছিলই।

মাছরাঙ্গা টিভি তো শুধু বর্ষীয়ান নেতা ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য দিয়ে একটা প্রতিবেদন করে ফেল্লো রাস্তায় প্রতিবাদের নানা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নিয়ে। এই প্রবীন গুনী রাজনীতিবিদ বললেন যারা এভাবে রাস্তায় নামে এরা পাগল, মানসিকভাবে অসুস্থ!

বেশ! এক অর্থে এটা হয়তো বলা যেতেও পারে যেহেতু উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকা এইসব মানুষেরা অস্তিত্বের তাগিদে ঢাকার নরম-সরম, আদুরে, বিলাসী লোকদের সম্ভাব্য সমস্যার কথা ভাবেনি। কিন্তু তা কতটা যোক্তিক!

কেননা সারা বছর সারা দেশজুড়ে সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল যেভাবে প্রধান সড়ক ও ছোট রাস্তা দখল করে ঘন্টার পর ঘন্টা তথা-কথিত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, মিছিল করে তখন কয়টা সাধারন মানুষ তার প্রতিবাদ করে, কয়টা পত্রিকা-টিভি চ্যানেল বিশেষ প্রতিবেদন করে???

কড়াইল বস্তিবাসীদের মানবেতর জীবন নিয়ে তাদের প্রতিবাদের পর টনক নড়েছে অনেকেরই। বেশকিছু পত্রিকা বিশেষ প্রতিবেদন করেছে খোলা আকাশের নীচে থাকা প্রায় ২০,০০০ মানুষের অবস্থা নিয়ে, কয়েকটি টিভি চ্যানেলে টক শো হয়েছে যেখানে বক্তারা সরকারকে একেবারে ধুয়ে ফেলেছে। সংবিধান এমনকি মানবাধিকার লংঘনের দায়ে সরকারকে দায়ি করেছে তারা।

আমার প্রশ্ন, ঠিক একদিন আগে আপনার কোথায় ছিলেন?

এই ২ কোটি লোকের শহরে ৪০ লাখ মানুষ থাকে ৪,৭২০ টি বস্তিতে! এদের বেশিরভাগই প্রাকৃতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় পড়ে কাজের খোঁজে ঢাকায় এসেছে আর ইতিমধ্যেই ছোটখাট নানা কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে। স্বল্প মজুরিতে কাজ করতে হয় বলে তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধার অবস্থা হয় খুবই নাজুক।

এমতাবস্থায়, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য না করে, গ্রামীন অবস্থার উন্নতি না করে, ঢাকা শহরকে বিকেন্দ্রীকরণ না করে সরকার (হাসিনা ভোটের আগে বস্তিবাসীদের জন্য চোখের পানি ফেলেছেন) এখন কোন যুক্তিতে আর কার বুদ্ধিতে এদের হুটহাট শহর থেকে বিতাড়িত করছে?

আর যদি তাই করতে চান (ড্যাপের তোয়াক্কা না করে) তবে তার প্রস্তুতি কোথায়? রাতারাতি এভাবে লাখখানেক মানুষের দায়িত্ব না নিয়ে সরিয়ে দিলে তা কি কোন শত্রুদেশের আক্রমনের মত মনে হয়না? এভাবে দায়িত্ব এড়ানোর মত উপায় কি আছে সরকারের? সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা নেই কেন?

কেন জমির দখলদারদের না ধরে, বিচার না করে এভাবে বারবার গরিব-মেহনতি মানুষগুলোর উপর চড়াও হয় তথাকথিত ‘গনতান্ত্রিক’ সরকারি বাহিনী?

আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি সবার চরিত্র একই রকম। এরা সবাই ধনী ব্যবসায়ি, উচ্চ-মধ্যবিত্ত আর তাদের নিজের দলের লোকদের জন্য সকল ন্যায়-অন্যায় কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর জন্য কিন্তু করতে গেলেই উনাদের ত কাঁপে আর কখনো কখনো ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবুও এরা নির্বাচনে দাঁড়ায়, গরিব মানুষের ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে আর তারপর নিজের কাজে মনযোগ দেয়।

আমি আরো ধিক্কার দেই তথাকথিত সচেতন-শিক্ষিত সমাজকে যারা অনেক কিছু জেনে-বুঝেও চুপ থাকে বা শুধু নিজের বলয়ে চাপাবাজি করে বেড়ায়, কিন্তু গরিব-অশিক্ষিত-অনগ্রসর মানুষদের কথা বলেনা।

Advertisements