শনিবার দুপুরে দুই বছর সাত দিন বয়সী ইয়ামিন মারা যাবার পর শাহজালাল টেকনোলজি ও ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী ও পুলিশের সাথে আলোচনার পর গরীব দিনমজুর মোঃ সেলিমের পরিবারকে ৫লাখ টাকা দেয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে। আর পুলিশের বেঁধে দেয়া শর্ত অনুযায়ী নির্মানকাজ বন্ধ রেখে আগে চটের আস্তরন দেয়ার কাজ শুরু করে।সোমবার দুপুরে আদাবর রিং রোড সংলগ্ন হক সাহেবের গ্যারেজের গলির মোহনপুর এলাকায় অবস্থিত ভবনটির পাশেই ইয়ামিনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মিলাদ চলছে। আর এদিকে নয়-তলা ভবনটির নির্মান কাজ বন্ধ ছিল।

বাড়িটির একদিকে একটি ভবন আছে আর বাকি তিনদিকে সরু রাস্তা। এর পশ্চিম দিকে রাস্তাটির পাশেই কয়েকটি ঘর মিলে একটা বাড়ির সীমানা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়েছিল ইয়ামিন। সে অপেক্ষা করছিল আরেকটি শিশুর জন্য যাকে তার মা দোকানে পাঠিয়েছিলেন ওর জন্য চকলেট আনতে।

কিছুক্ষন আগে তার মাথা ন্যাড়া করার সময় কাঁদছিল শিশুটি যার বয়স দুই বছর পূর্ণ হলো গত শনিবারে। সেই কান্না থামাতেই তার মা চকলেট আনতে পাঠান অন্য শিশুটিকে।

এর মধ্যে কাজ চলতে থাকা ভবনটির ৮তলা থেকে বড় একটি কাঠের খন্ড এসে পড়ে ইয়ামিনের কাছে, আর সেটি ভেঙ্গে একটি টুকরো ওর মাথার পেছনের দিকে আঘাত করে। সেই টুকরোটিতে একটি পেরেক ছিল যা তার খুলিতে ঢুকে যায়, মুহুর্তেই জ্ঞান হারায় সে।

বাড়ির লোকজন মিলে রিকশা করে ইয়ামিনকে নিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। সেখানে স্যালাইন ও অক্সিজেন দেয়া হয় তাকে। কিন্তু অক্সিজেন মাস্ক পরানোর সাথে সাথে নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করে। এতে চিন্তিত হয়ে ডাক্তাররা তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেবার জন্য বলে।

কিন্তু দ্রুততার সাথে কাজটি করার জন্য হাসপাতালের কোন এম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। অগত্যা সেই চত্বরে থাকা একটি প্রাইভেট এম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা মেডিকেল রওনা হন তারা।

কিন্তু আসাদ গেট পৌঁছাতেই ইয়ামিনের নাড়ির স্পন্দন থেমে যায়। তবুও শেষ চেষ্টা করতে তারা ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগে পৌঁছালেন, কিন্তু সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষনা করে। ময়নাতদন্তের ঝামেলা এড়িয়ে তারা চলে আসেন বাসায়।

কি হৃদয়বিদারক, কি দুঃখজনক একটি ঘটনা…যেখানে ইয়ামিন বা তার পরিবার পূর্বপ্রস্তুতির কথা চিন্তাই করতে পারেনি যেহেতু ভবনটির কাজ চলছিল এক বছর আগে থেকেই।

কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে এলাকার সবাই সাবধান হয়ে গেলেন। দেখা গেল এর আশপাশ দিয়ে যাবার সময় সবাই কেমন দুঃশ্চিন্তায় থাকেন।

কর্তৃপক্ষ বললেন তারা নিরাপত্তার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। এমনকি মোঃপুর ও মিরপুরে তাদের আরো যে প্রায় ৬টি প্রকল্পের কাজ হচ্ছে সেখানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।

এই যে এখন দৌড়াদৌড়ি শুরু হল, কিছু টাকা খরচ করছে কর্তৃপক্ষ–এটা আগে করলে তো আর এত বড় ঘটনাটা ঘটতো না, খুন হত না অবুঝ শিশুটি আর নিজেদের মান-ইজ্জতটাও বেঁচে যেত।

এরকমই সাবধান হয়েছিল পান্থপথে সাগুফতা গ্রুপের একটি নির্মানাধীন ভবনের কর্তৃপক্ষ। গত বছর এর সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় মাথায় ইট পড়ে মারা যান বিজ্ঞান কলেজের এক এইচএসসি পরিক্ষার্থী।

পরবর্তীতে হাইকোর্টের এক রুলিং-এর জবাবে যাদের কাজ ভবনের নকশা অনুমোদন ও তা পালন হচ্ছে কিনা এবং ইমারত নির্মান বিধিমালার বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দেখা সেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক জানায় লোকবলের অভাবে তারা মনিটরিং কার্যক্রম চালাতে পারছেনা।

রবিবার ভবনটির সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখলাম পুরোটা চট দিয়ে ঢাকা। অথচ আগে কিছু অংশ খোলা ছিল এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের শুধুমাত্র খামখেয়ালীপনার জন্য।

শুধু পথচারী নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মানের কারনে তার চেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন নির্মান শ্রমিকেরা যাদের নিরাপত্তার জন্য গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কেউই বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেয় না।

পুলিশ বা হাউজিং ব্যবসায়িদের প্রতিষ্ঠান রিহ্যাব দূর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাহলে কি আমরা পূর্বপ্রস্তুতির দিকে যাবনা!

 

Advertisements