ঢাকার অধ:পতনঃ দায়ি আমাদের মানবিকতার পতন


dhakacityগতকাল এক জরিপের ফলাফলে জানতে পারলাম আমাদের ঢাকা শহর বসবাসের যোগ্যতার বিচারে ১৪০টি দেশের মধ্যে তৃতীয় হয়েছে, তালিকার শেষ দিক থেকে।

মাপকাঠি ছিল রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অপরাধ প্রবণতার অবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং পরিবেশ।

দুই বছর আগে, ইকোনমিস্টের গবেষনা বিভাগের এই জরিপে আমরা ছিলাম ১৩৮তম অবস্থানে।

তারও আগে, ২০০৭ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন জরিপে ২১৫টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ২১৩—বিবেচনার বিষয় ছিল বায়ু দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সেবা ও সংক্রামক রোগের ব্যপ্তি।

মাত্রাতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, অসহনীয় যানজট, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধার অভাব, বিশুদ্ধ পানির অভাব, আর দুষনের কারনে এইরকম ফলাফল অযৌক্তিক ঠেকছে না।

রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশাপাশি সাধারন মানুষের একটা বড় দায়িত্ব আছে এই শহরকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্যে। কেননা আমরা জানি যে সরকারি কাজে ফাঁক থাকবেই, তথাকথিত অভাবও থাকবে, সুতরাং আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে সবার।

আমি মনে করি আমাদের প্রথম কাজ হবে আমাদের থাকার ও কাজের জায়গার আশেপাশের জায়গাগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখা, তবেই কাজ কমে যায় অনেকটাই। আর যদি সেটা নিয়মিত করা হয় তবে তা অবশ্যই জঞ্জাল কমাবে। অন্তত আবর্জনাগুলো ডাস্টবিন পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো জমতে দেয়া যাবেনা।

পাশাপাশি স্বাস্থ্য-সচেতন হতে হবে, নয়তো পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা মাথায়ই আসবেনা।

আর ‘এই শহরের মালিক আমি না, যে বাড়িতে থাকি সেটাও আমার না, রাস্তাটাও আমার না, তবে কেন আমাকে এত কিছু নিয়ে ভাবতে হবে?’-এই ধরনের চিন্তা ধুয়ে ফেলতে হবে। মালিক না হলেও ব্যবহারকারীরও আবশ্যই দ্বায়িত্ব আছে।

পরিচ্ছন্নতা থেকেই আসে মানসিক স্বাভাবিকতা, প্রফুল্লতা, নমনীয়তা, এবং আচরণগত উন্নয়ন।

যার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অপরাধ প্রবনতা কমে আসবে। কারন মানুষগুলো যখন তাদের কাজের জায়গাতে চিন্তা-ভাবনা করে জীবনযাপন করবে, জটিলতার অবকাশ সেখানে নেই বলেই আমার বিশ্বাস।

সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের — যা আমাদের মানবিকতা ও রসবোধের এক গুরূত্বপূর্ণ উপাদান — সাথে জড়িত থাকলে কোন সন্দেহ নেই আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে টের পাচ্ছি যে, আমরা অনেক কিছুই জানি কিন্তু করিনা বলে বা মানতে পারিনা বলে পিছিয়ে পড়ি ভাল কাজ থেকে, ভাল আচরন ও ভাবনা থেকে।

আমি কিছুটা করি, যতক্ষণ না আমি সময়ের চাপে উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাই, আমার পাশের মানুষদের বলি, তাদের সামনে কাজগুলো করি—তথাপি আমার এই তিন দশকের জীবনে বেশিরভাগ মানুষকেই দেখলাম তারা আগাগোড়া উদাসীন, নিজেরটা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। আর সেটা সম্পন্ন করতে সমস্যা হলে অন্য কারও ঘাড়ে চাপিয়ে দিব্যি জীবন পার করে দিচ্ছেন।

আর যাদের কথা শুনি, বা টিভিতে দেখি, দেশের সেইসব হোমড়াচোমড়াদের দেখি তারাও অনেক জানেন, বোঝেন, কিন্তু করেন না, অথবা বলা যায় করতে পারেন না।

সেক্ষেত্রে অবশ্য যুক্তি তৈরী থাকে – তারা আসলে চেষ্টা করছেন, ঠিক হয়ে যাবে, আগের সরকার কিছু করেনি… এখানে সাধারন মানুষ, সাধারনত মন্ত্রী-এমপি-বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের গালমন্দ করার কারনে আমার মনে হয় আসল দায়ী লোকগুলো আড়ালে পড়ে যায়।

তারা হচ্ছেন নানা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্তা, মাঠপর্যায়ের কর্তা ও পরিদর্শন কর্তা—যারা কাজে ফাঁকি দেন বলে নানা ওয়াদা বা উদ্যোগ বাস্তবের মুখ দেখেনা বা পূর্ণ মাত্রা পায়না।

এরা সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ দ্বায়িত্বে থেকেও গাফিলতি করেন—হয় জালিয়াতি করার উদ্দেশ্যে বা পারেন না বলে।

আর আমরা সাধারন মানুষ যারা রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত নই, তারা তবু কেন যেন সেই উঁচুতলার ওদের দিকেই তাকিয়ে থাকি।

এভাবেই কেটে যাচ্ছে বছরের পর বছর, কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে খুবি সামান্য। কারন সেই গাফিলতি, যা আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যাস ক্রমশ সাধারন মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আমাদের চোখের, ভাবনার, কাজের ব্যপ্তি কমে যাচ্ছে, আমরাও বেখেয়ালি হয়ে যাচ্ছি। আর আমাদের নৈতিক এই অবনতির কারনে দুষ্টের কারসাজি ক্রমেই বাড়ছে, আমাদের চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ সবই ধংস হচ্ছে ক্রমশ।

একটা সুন্দর জীবন যাপন করতে চাইলে আমাদের থামতে হবে, ঘুরে দাঁড়াতে হবে আর আশায় বুক বেঁধে বদলাতে হবে নিজেদের, এগিয়ে যেতে হবে সামনের পানে—তবেই ঘুচবে মানসিক, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বৈকল্য আর আমরাও পারবো একটা মেলবোর্ন, ভিয়েনা বা টরেন্টো গড়তে, একটা গোছানো-পরিপাটি-সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে।

নিজের, পরিবারের, সমাজের, দেশের কল্যানে ব্যক্তি মানুষের জাগরণ এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। একটা শক্ত ভিত্তি গঠন খুবই জরুরি।

***
ফিচার ছবি: Bir Azam এর ফ্লিকার স্ট্রিম থেকে সংগৃহিত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s